reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ২৪ জুলাই, ২০২৬

নীরব মহামারি ডিমেনশিয়া

সচেতনতা ও সামাজিক সুরক্ষার এখনই সময়

বিশ্বব্যাপী প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া একটি নীরব স্বাস্থ্য সংকট হলো ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার এই রোগটি কেবল আক্রান্ত ব্যক্তির স্মৃতিশক্তিই কেড়ে নেয় না, বরং তার প্রাত্যহিক জীবনকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে তোলে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হলেও, সমাজে ব্যাপক সচেতনতার অভাব ও অপর্যাপ্ত পরিচর্যার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, ডিমেনশিয়া কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়, বরং এটি বিভিন্ন রোগের একটি সমষ্টিগত রূপ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, শারীরিক নিস্ক্রিয়তা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এই রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

বলা সংগত, দেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রতি ১২ জনের মধ্যে অন্তত একজন ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, আমাদের দেশে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। আক্রান্ত রোগীদের সিংহভাগই শনাক্তের বাইরে থেকে যান এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও বোঝেন না কীভাবে একজন ডিমেনশিয়া রোগীর যত্ন নিতে হয়। বয়স্কদের এই ভুলে যাওয়া রোগকে অনেক সময় স্বাভাবিক বার্ধক্যের অংশ মনে করে অবহেলা করা হয়, যার ফলে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকে। দ্রুত বাড়তে থাকা প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ডিমেনশিয়ার প্রকোপ বাড়লেও রোগীদের পরিচর্যা ও চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা এখনো অপ্রতুল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। দেশে ডিমেনশিয়া কেয়ার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং এ বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষে গত বুধবার রাজধানীতে দিনব্যাপী এক কর্মশালায় এসব তথ্য ওঠে এসেছে। জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ নার্সিং কলেজ ও বাংলাদেশ জেরিয়াট্রিক নার্সেস সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে কলেজটির অডিটোরিয়ামে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হাসপাতালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সরদার এ. নাঈম বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। তবে শনাক্তের বাইরে থাকা রোগীর সংখ্যা এর পাঁচগুণ পর্যন্ত হতে পারে। দিন দিন রোগের প্রকোপ বাড়লেও সে তুলনায় পরিচর্যা ও চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংকট রয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগ, বিশেষ করে ডিমেনশিয়ার প্রকোপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ডিমেনশিয়া সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত এবং মানসম্মত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে।

বলা বাহুল্য, ডিমেনশিয়ার এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত নিরাময়যোগ্য চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে এর গতি কিছুটা মন্থর করা সম্ভব। প্রবীণ বয়সে এসে একজন মানুষ যাতে অসম্মান বা অবহেলার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ডিমেনশিয়া আক্রান্ত রোগীদের জন্য একটি সহানুভূতিশীল এবং নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সময়ের দাবি। সেই বাস্তবতায় চিকিৎসক, নার্স, সেবাদানকারী এবং পরিবারের সদস্যদের সমন্বিত প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। পাশাপাশি ডিমেনশিয়া রোগীদের মানবিক, বৈজ্ঞানিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়