মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

  ১৪ ঘণ্টা আগে

দৃষ্টিপাত

বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষি

একটি দেশের উন্নয়ন শুধু উঁচু অট্টালিকা, প্রশস্ত মহাসড়ক কিংবা শিল্পকারখানার সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি হলো মানুষের কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা। যে সমাজে কর্মক্ষম মানুষ কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, সেখানে দারিদ্র্য কেবল অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে না; বরং সামাজিক বৈষম্য, হতাশা ও অস্থিরতারও জন্ম দেয়। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য দূর করা উন্নয়নশীল দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত, টেকসই এবং কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো কৃষি। কারণ কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি কোটি মানুষের জীবিকা, গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি এবং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি।

ইসলাম মানুষকে শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেয়নি; বরং হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জন, উৎপাদনশীল কাজ এবং মানবকল্যাণের দিকেও উৎসাহিত করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই পৃথিবীকে তোমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা এর পথে চলাফেরা করো এবং তার দেওয়া রিজিক থেকে আহার করো।’ (সুরা আল-মুলক : ১৫)। তাই কৃষি কেবল একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়; এটি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের সঠিক ব্যবহার এবং মানবসেবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে জড়িত। তবে কৃষির পরিচয় এখন আর শুধু ধান, পাট কিংবা গমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উদ্যোক্তা সংস্কৃতির বিকাশ কৃষিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

আজ অনেক শিক্ষিত তরুণ চাকরির অপেক্ষায় সময় নষ্ট না করে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস দেখাচ্ছেন। বাণিজ্যিক ফলচাষ, উচ্চমূল্যের সবজি উৎপাদন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, নার্সারি, ছাদ কৃষি, মৌচাষ, কৃষিপণ্য বিপণন এবং কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার খুলে দিচ্ছে। কৃষি এখন শুধু লাঙল আর হালের গল্প নয়; এটি প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তাবোধের এক নতুন অধ্যায়।

মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও দুগ্ধ খাতও কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ডেইরি ফার্ম, গরু মোটাতাজাকরণ, ছাগল ও ভেড়া পালন, হাঁস-মুরগির খামার এবং আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের মাধ্যমে হাজারো তরুণ আত্মনির্ভর হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পেও নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে।

বর্তমানে কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ড্রোনের মাধ্যমে ফসল পর্যবেক্ষণ, স্মার্ট সেচব্যবস্থা, আইওটি প্রযুক্তি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মোবাইল অ্যাপে বাজারদর জানা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ প্রযুক্তিমনস্ক তরুণদের কৃষির প্রতি আগ্রহী করে তুলছে। কৃষি ও প্রযুক্তির এই সমন্বয় ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের নতুন ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।

দারিদ্র্য বিমোচনেও কৃষির ভূমিকা অনস্বীকার্য। একজন কৃষকের আয় বাড়লে শুধু একটি পরিবারের অবস্থার উন্নতি হয় না; পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিই প্রাণ ফিরে পায়। স্থানীয় বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ে, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন, কুটির শিল্প এবং সেবা খাত সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও কৃষির বিকল্প নেই। দরিদ্র পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাদ্য কেনায় ব্যয় হয়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে খাদ্যের সরবরাহ বাড়ে, বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে এবং মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয়। সুস্থ, কর্মক্ষম ও দক্ষ জনগোষ্ঠীই একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সবচেয়ে বড় সম্পদ।

গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও কৃষির অবদান গুরুত্বপূর্ণ। হাঁস-মুরগি পালন, বসতবাড়িতে সবজি চাষ, মাশরুম উৎপাদন, মৌচাষ এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে অসংখ্য নারী পরিবারের আয় বাড়াচ্ছেন। এর ফলে শুধু সংসারের আর্থিক অবস্থাই উন্নত হচ্ছে না; নারীর আত্মবিশ্বাস, সামাজিক মর্যাদা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কৃষির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প। মাঠের উৎপাদন যখন কারখানায় পৌঁছে মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপ নেয়, তখন কৃষিপণ্যের মূল্য কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফল, সবজি, মসলা, দুধ কিংবা শস্য প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করা গেলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান, নতুন শিল্প গড়ে ওঠে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ভবিষ্যতের কৃষি অর্থনীতিতে এই খাতের গুরুত্ব আরো বাড়বে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষিকে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। উৎপাদন করেও অনেক কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, সহজ শর্তে কৃষিঋণের সীমাবদ্ধতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার নানা অসঙ্গতি কৃষকের লাভ কমিয়ে দেয়।

এসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ। জলবায়ু-সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন, কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ,

তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কোল্ড স্টোরেজ সম্প্রসারণ এবং কৃষকের সঙ্গে বাজারের সরাসরি সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, রপ্তানি সক্ষমতা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে ‘কতকিছুর হাট’-এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, আমাদের কৃষকেরা পরিশ্রমে কখনো পিছিয়ে থাকেন না। তারা শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা, আধুনিক প্রযুক্তি, ন্যায্য বাজার এবং রাষ্ট্রের কার্যকর সহযোগিতা চান। কৃষকের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু একটি পেশাকে সহায়তা করা নয়; বরং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ভিত্তিকে আরো শক্তিশালী করা।

বেকারত্ব ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে কৃষিকে আর শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, গবেষণাভিত্তিক এবং লাভজনক শিল্প খাতে রূপান্তর করতে হবে। কারণ কৃষি শক্তিশালী হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, দারিদ্র্য কমবে, গ্রামীণ অর্থনীতি গতিশীল হবে এবং জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি আরো সুদৃঢ় হবে।

আজ সময়ের সবচেয়ে বড় আহ্বান- কৃষিকে বাঁচানো মানেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, কৃষককে বাঁচানো মানেই দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। আর কৃষিকে সমৃদ্ধ করা মানেই একটি দারিদ্র্যমুক্ত, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।

লেখক : কৃষি উদ্যোক্তা ও পরিচালক, কতকিছুর হাট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়