reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১ ঘণ্টা আগে

দুই বছরের সাজার ঝুঁকিতে গাজী নজরুল ইসলাম

ছবি : গাজী নজরুল ইসলামের ফেসবুক পেজ

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের কথিত বিয়ে নিবন্ধন নিয়ে যে ঘটনাটি ঘটেছে, তাতে তিনি দুই বছরের কারাদণ্ডের ঝুঁকিতে আছেন। আর যদি এই সাজা হয় তাহলে সংবিধান অনুযায়ী তিনি আর সংসদের সদস্য থাকতে পারবেন না।

এরই মধ্যে জামায়াত নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, যদিও সংবিধান অনুযায়ী দল কাউকে বহিষ্কার করলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয় না। নবম সংসদে গাজী নজরুলের আসন সাতক্ষীরা ৪-এ জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য এইচ এম গোলাম রেজা এবং দশম সংসদের সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীও দল থেকে বহিষ্কারের পরেও সংসদ সদস্য ছিলেন।

একটি কক্ষে এক তরুণীর সঙ্গে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর জামায়াত নেতা দাবি করেছেন, তিনি বিয়ে করেছেন গত ১৭ জুন। কিন্তু সেটি যিনি নিবন্ধন করেছেন, সেই কাজি জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার অর্থাৎ ২১ জুলাই এটি নিবন্ধিত হয়েছে। এই হিসেবে সময়ের পার্থক্য দাঁড়ায় ৩৪ দিন। কিন্তু বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করতে হয়।

মুসলিম বিবাহ এবং তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪-এর ৫ (২) ধারায় বলা আছে, নিকাহ নিবন্ধক ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি দ্বারা বিয়ে পড়ানো হলে বর সেই বিয়ের তারিখ হতে ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিকাহ নিবন্ধককে বিষয়টি জানাবেন।

উপ-ধারা (২)-এর অধীন বিয়ের বিষয়ে নিকাহ নিবন্ধক জানলেই তিনি অবিলম্বে সেই বিয়ে নিবন্ধন করবেন।

উপধারা ৪ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি এই ধারার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে, তিনি অপরাধ করবেন এবং অনূর্ধ্ব দুই বছর মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক তিন হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

একটি কক্ষে স্বল্প বয়সি এক তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুলের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর মঙ্গলবার গাজী নজরুল তার ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়ে দাবি করেছেন, গত ১৭ জুন সেই তরুণীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে।

যে নিবন্ধনের ছবি ছড়িয়েছে, তাতে কাজির নাম হিসেবে বদরুল আলম মো. বাকী বিল্লাহর সিলমোহর আছে। তিনি সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ১২ নং গাবুরা ইউনিয়নের কাজি। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি বিয়ে পড়াননি। কেবল নিবন্ধন করিয়েছেন।

তবে এই নিবন্ধন ও বিয়ের তারিখের মধ্যে পার্থক্য আছে। কাজি জানিয়েছেন, সোমবার রাতে তাকে ফোন করে জানানো হয় যে ঢাকায় বিয়ে হয়েছে এবং তাকে এটি নিবন্ধন করতে হবে। আর পরদিন নিবন্ধনটি হয়।


আরো পড়ুন : এমপি গাজীর বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে কমিশন


ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিয়ের সব দায় দায়িত্ব স্বামীর ওপর বর্তায়। নিবন্ধনও তার দায়িত্ব। এ কারণে এখানে আইনের লঙ্ঘন হলে স্বামীরই শাস্তি হবে।’

এ ক্ষেত্রে মামলা কে করবেন—এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘স্ত্রী করতে পারেন, আর তিনি যদি আগ্রহী না হন, তাহলে পুলিশ করতে পারে বা রাষ্ট্রপক্ষ করতে পারে।’

বাল্যবিয়ে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী বা তার পরিবারের কেউ আগ্রহী না হলে পুলিশ বা রাষ্ট্র বাদী হয়ে মামলা করে থাকে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদা খানম জানিয়েছেন, রাষ্ট্র বা পুলিশ বাদী না হলে অন্য কারও পক্ষেও মামলা করার সুযোগ আছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্য কোনো মানুষও যদি মনে করে এ সমস্ত কর্মকাণ্ডে সমাজের ক্ষতি হতে পারে, তাহলে তিনিও পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশনে আওতায় প্রতিকার চাইতে পারেন।’

অন্যদিকে, সংবিধানের ৬৬ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে তিনি আর সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না।

ঝুঁকিতে আছেন বিয়ের নিবন্ধক সেই কাজি বাকী বিল্লাহও। কারণ, মুসলিম বিবাহ এবং তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪-এর ১১ ধারায় বলা আছে, যদি সরকার মনে করে, কোনো নিকাহ নিবন্ধক তাহার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অসদাচরণের দোষে দোষী, তাহলে সরকার তার লাইসেন্স বাতিল, বা দুই বছর পর্যন্ত তা স্থগিত করতে পারতে পারবে।

ঘটনার পর কাজি তার মোবাইল ফোন বন্ধ করে রেখেছেন।

গাজী নজরুলের কথিত সেই বিয়ে এবং কাজি বাকী বিল্লাহ মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ অনুযায়ীও শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। এই আইনের ৬ ধারায় কেউ স্ত্রী থাকা অবস্থায় আবার বিয়ে করতে চাইলে সালিস পরিষদের পূর্বানুমতি লিখিতভাবে গ্রহণ করতে হবে।

এ ধরনের অনুমতি ছাড়া কোনো বিয়ে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪-এর অধীনে নিবন্ধিতও হবে না।

গাজী নজরুল বলেছেন, মেয়ের বাবার বাড়িতে তার বিয়ে হয়েছে। কিন্তু সেটি গ্রামের বাড়ি নাকি ঢাকার মিরপুরের কালশী আলিনগর রোজ গার্ডেন টাওয়ারে, সেটি তিনি উল্লেখ করেননি।

সেই বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীর কাছে এই কথিত বিয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার এ বিষয়ে কথা বলতে নিষেধ আছে।’

কালসী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং গাবুরা একটি ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে। দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে গাজী নজরুলকে হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অথবা গাবুরার চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করতে হতো।

কিন্তু গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জি এম মাছুদুল আলম নিশ্চিত করেছেন, সংসদ সদস্য গাজী নজরুল দ্বিতীয় বিয়ে করার কোনো আবেদন করেননি। আর কোনো সালিসি পরিষদও হয়নি।

আইনজীবী নাহিদা খানম বলেন, ‘স্ত্রী শারীরিকভাবে অক্ষম, সন্তান দানে অক্ষম বা মনোমালিন্য-এসব কারণ দেখিয়ে দ্বিতীয় বিয়ের আবেদন করা যায়।’

গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী সন্তান জন্মদানে অক্ষম নন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া হলফনামায় তিনি নিজের সন্তানের নাম উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে মনোমালিন্য আছে কি না, সেই প্রশ্নের জবাব পাওয়া সম্ভব নয়। তবে স্বামীর বিপদে তিনি এগিয়ে এসেছেন। বলেছেন, তার স্বামীকে নিয়ে কেউ অপপ্রচার চালালে তিনি আইনি ব্যবস্থা নেবেন। যে নিবন্ধন করা হয়েছে, সেখানেই উল্লেখ আছে সালিস কাউন্সিলের কাছ থেকে বরের কাছে লিখিত অনুমতিপত্রের নম্বর নেই।

আইন অনুযায়ী এভাবে বিয়ের সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত সাধারণ কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। এ ছাড়া বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের প্রাপ্য সম্পূর্ণ দেনমোহর, তা তাৎক্ষণিক হোক বা বিলম্বিত, অবিলম্বে পরিশোধ করতে হবে এবং পরিশোধ না করলে সেই অর্থ ভূমি রাজস্ব বকেয়ার ন্যায় আদায়যোগ্য হবে। তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়