মোঃ লালমিয়া, তারাগঞ্জ (রংপুর)
মবের শিকার রূপলালের স্বজনদের চোখে শুধুই অন্ধকার

একটি নির্মম ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির ঘটনা কেড়ে নিয়েছে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে। আর তার সঙ্গেই চিরতরে নিভে গেছে একটি পরিবারের সচ্ছলতার আলো। উগ্র মবের হিংস্র থাবায় নিহত রূপলাল দাসের পরিবারের দিন এখন কাটছে চরম অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্ট আর সীমাহীন মানসিক যন্ত্রণায়। দুবেলা দুমুঠো অন্ন জোগাড় করাই এখন তাদের জন্য এক পর্বতসম লড়াই।
সরেজমিনে রূপলাল দাসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। যে মানুষটি প্রতিদিন সকালে হাসিমুখে কাজের সন্ধানে বের হতেন, আজ ঘরের কোণে ঝুলছে কেবলই তাঁর বাঁধানো একটি ছবি। রূপলালের অকাল প্রস্থানে পুরো পরিবারটি আজ অথৈ সাগরে ভাসছে। একমাত্র ছেলের শোকে বৃদ্ধ মা পাথর হয়ে গেছেন। চিকিৎসার খরচ তো দূরের কথা, নিয়মিত দুমুঠো খাবার জোটানোই এখন তাঁদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে সন্তানদের ভবিষ্যৎ। রূপলালের সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম। স্কুল ড্রেস আর খাতার খরচ জোগাতে না পেরে ডুকরে কাঁদছেন তাঁর স্ত্রী। সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে গিয়ে ইতিমধ্যে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ধারদেনা করতে হয়েছে। এখন পাওনাদারদের তাগাদায় দিশেহারা এই পরিবার।
রূপলালের স্ত্রী মালতী রাণী অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, "যারা আমার স্বামীকে এভাবে পিটিয়ে মারল, তারা তো শুধু একজন মানুষকে মারেনি, আমার পুরো পরিবারটাকে জীবন্ত কবর দিয়ে গেছে। আমরা আজ না খেয়ে দিন কাটাচ্ছি, কেউ আমাদের খোঁজ নিতে আসে না। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই, আর সন্তানদের বেঁচে থাকার একটা গতি চাই।"
নিহত রূপলালের ছেলে জয়দাস জানায়, সে তারাগঞ্জ ও/এ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ে। বড় হয়ে আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু বাবাকে হারানোর দিনই তার সেই স্বপ্নের সমাধি হয়েছে। এখন সে মাঝে মাঝে স্কুলে যায়, আর বাকি সময় বাবার পেশা বেছে নিয়ে পুরোনো জুতা সেলাইয়ের কাজ করে। সেই সামান্য আয়ে মা, বোন ও দাদিকে নিয়ে কোনো রকমে খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটছে তাদের।
রূপলালের বৃদ্ধ মা লাচিয়া দাস বিলাপ করতে করতে বলেন, "রূপলালই ছিল আমার একমাত্র ছেলে। ওকেই ওরা পিটিয়ে মেরে ফেলল। আমার আদরের ছোট ছোট নাতি-নাতনিগুলোকে অমানুষগুলো এতিম বানিয়ে দিল। ভগবান ওদের বিচার করবেন।"
ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি পরিবারটিকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সামান্য কিছু প্রাথমিক সাহায্য পেলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সংকটের তুলনায় সমুদ্রের এক ফোঁটা পানির মতো। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, কেবল সান্ত্বনা বা সাময়িক সাহায্য নয়, রূপলালের পরিবারকে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট মেয়ের বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করতে জামাতা প্রদীপ দাসকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিলেন রূপলাল দাস। পথিমধ্যে উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের বুড়ীরহাট ছেতরা বটতলা নামক স্থানে পৌঁছালে কতিপয় লোক ভ্যানচোর সন্দেহে শ্বশুর রূপলাল ও জামাতা প্রদীপকে গণপিটুনি দেয়। ঘটনাস্থলেই রূপলাল দাস নিহত হন এবং পরে জামাতা প্রদীপ দাস রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এই ঘটনায় রূপলালের স্ত্রী মালতী রাণী দাস বাদী হয়ে তারাগঞ্জ থানায় ৭০০ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
একটি সভ্য সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এভাবে একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেওয়ার সংস্কৃতি রুখে দাঁড়ানোর সময় এখনই। রূপলালের পরিবারের এই বোবা কান্না কি পৌঁছাবে প্রশাসনের কর্ণকুহরে? নাকি আর দশটা ঘটনার মতোই ফাইলের নিচে চাপা পড়ে হারিয়ে যাবে এই অসহায় মানুষগুলোর আর্তনাদ? সেই উত্তরই এখন খুঁজছেন নিহতের স্বজনেরা।
পিডিএস/এমএইউ








































