মোহাম্মদ আবু ইউসুফ
যে দৃশ্য আজও কাঁদায় বাংলাদেশকে

২০২৪ সালের সেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের স্মৃতি আজও বাংলাদেশের আপামর মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের তীব্র উত্তাল দিনগুলোর মধ্যে ১৮ জুলাই ছিল অন্যতম এক কালরাত ও দিন। দেশজুড়ে চলছিল ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। আর সেই কর্মসূচিতেই সাভার বাসস্ট্যান্ডে শত শত মানুষের চোখের সামনে ঘটে যায় ইতিহাসের অন্যতম এক নির্মম ও হৃদয়বিদারক ঘটনা, যা পরবর্তী সময়ে গোটা আন্দোলনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। পুলিশের আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) গাড়িতে ঝুলে থাকা শহিদ শায়খ আসহাবুল ইয়ামিনের সেই রক্তাক্ত ও নিথর দেহের ছবি আজও কাঁদায় পুরো দেশকে।
স্বপ্নের অকালমৃত্যু: ২০০১ সালের ডিসেম্বরে জন্ম নেওয়া শায়খ আসহাবুল ইয়ামিন ছিলেন একাধারে মেধাবী ও প্রত্যয়ী তরুণ। সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করার পর বুয়েট এবং রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বেছে নেন রাজধানীর মিরপুরের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগকে। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সন্তান ইয়ামিন বাবা-মা ও বোনের সঙ্গে সাভারের ব্যাংক টাউন এলাকায় থাকতেন। সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা বাবা মো. মহিউদ্দিনের দুই সন্তানের মধ্যে ইয়ামিন ছিলেন ছোট।
যেভাবে স্তব্ধ হলো একটি প্রাণ: ১৮ জুলাই দুপুরে বাসার কাছের ব্যাংক টাউন জামে মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করেই বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিতে ছুটে যান ইয়ামিন। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তখন শিক্ষার্থী ও জনতার সাথে পুলিশ, র্যাব এবং তৎকালীন ক্ষমতাশীন দলের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলছিল।
বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি ছোড়া হচ্ছে দেখে নিজের জীবন বাজি রেখে ইয়ামিন পুলিশের একটি এপিসির ওপর উঠে যান এবং গুলি বন্ধ করার আহ্বান জানান। কিন্তু অত্যন্ত কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ওই এপিসির ওপরেই লুটিয়ে পড়েন।
নিষ্ঠুরতার সেই চরম রূপ: দুপুর ২টার দিকে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডের মনসুর মার্কেটের সামনে পুলিশের ‘ঢাকা জেলা-১৪’ লেখা এপিসির ওপর কালো শার্ট ও নীল প্যান্ট পরিহিত ইয়ামিনের দেহটি আটকে থাকতে দেখে উপস্থিত জনতা। গাড়িটি কিছুটা পিছিয়ে পাকিজা মোড়ে থামলে দুই পুলিশ সদস্য বের হয়ে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, এক পুলিশ সদস্য ইয়ামিনের প্যান্টে হেঁচকা টান দিয়ে তাকে নিচে ফেলে দেয়। চাকার সাথে দেহটি আটকে গেলে আবারো টেনেহিঁচড়ে রোড ডিভাইডারের ওপর দিয়ে টপকে তাকে লোকাল লেনে ফেলে দেওয়া হয়।
তখনও ইয়ামিনের দেহে প্রাণ ছিল। তাঁর সহযোদ্ধা বন্ধুরা মোবাইল ফোনে এই নৃশংস দৃশ্য ধারণ করেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে দ্রুত সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলে চলমান আন্দোলনে তিনিই ছিলেন প্রথম শহিদ।
দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও দাফনে বাধা: ইয়ামিনের ওপর পুলিশের এই বর্বরতার ভিডিও এবং এপিসিতে ঝুলে থাকার ছবি মুহূর্তেই দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই নিষ্ঠুরতা দেখে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ফেটে পড়ে এবং আন্দোলনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
এমনকি মৃত্যুর পরও রেহাই মেলেনি ইয়ামিনের। পরিবার অভিযোগ করে, হাসপাতাল থেকে মৃত্যু সনদ পেতে যেমন জটিলতা তৈরি করা হয়, তেমনি সাভারের তালবাগ মুসলিম কবরস্থানে দাফন করতে গেলে পুলিশ ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা বাধা দেয়। গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও ব্যর্থ হয় তৎকালীন প্রশাসনের বাধায়। অবশেষে ব্যাংক টাউন আবাসিক এলাকায় পারিবারিকভাবে তাকে তড়িঘড়ি করে দাফন করা হয়। ফ্যাসিবাদের দোসরদের ভয়ের কারণে শুভাকাঙ্ক্ষীরা ঠিকমতো তাঁর জানাজাটুকুও পড়তে পারেননি।
আন্দোলনের অমর অধ্যায়: ইতিমধ্যেই দুই বছর পেরিয়ে গেছে সেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের। গতকাল শনিবার ইয়ামিনের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর পরিবার ও বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে দোয়া, মিলাদ ও শোকসভার আয়োজন করা হয়।
শহিদ শায়খ আসহাবুল ইয়ামিন আজ কেবল একটি নাম নন, তিনি বাংলাদেশের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান আলোচিত অধ্যায় ও ত্যাগের প্রতীক। এপিসিতে ঝুলে থাকা তাঁর সেই ছবি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক চিরন্তন ক্ষত হয়ে থাকবে।
পিডিএস/এমএইউ








































