reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১ ঘণ্টা আগে

ইয়ামালের বাবা কে, মেসির সঙ্গে সেই বিখ্যাত ছবির সম্পর্ক কী

ফুটবল মহাতারকা মেসির সঙ্গে ছোট্ট ইয়ামাল। ছবি : সংগৃহীত

লামিনে ইয়ামালের বাবার নাম মুনির নাসরাউই। তিনি মূলত মরক্কোর লারাচে শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে শিশু বয়সে স্পেনে অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমান। অন্যদিকে ইয়ামালের মা, শিলা ইবানা, বিষুবীয় গিনির বাসিন্দা। ইয়ামালের পুরো নাম বাবা ও মায়ের পারিবারিক উপাধি মিলিয়ে রাখা হয়েছে—লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই ইবানা।

ইয়ামাল যখন খুব ছোট (প্রায় তিন বছর বয়স), তখন তাঁর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তবে তাঁর ফুটবলার হয়ে ওঠার পেছনে বাবা মুনির সবসময় ছায়ার মতো পাশে ছিলেন এবং শুরু থেকেই বিশ্বাস করতেন তাঁর ছেলে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা হতে যাচ্ছে।

লিওনেল মেসির সঙ্গে সেই বিখ্যাত ছবির সম্পর্ক কী

ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে ভাইরাল হওয়া লিওনেল মেসির কোলে থাকা সেই বিখ্যাত শিশুটি আর কেউ নন, স্বয়ং ৬ মাস বয়সী লামিনে ইয়ামাল। ২০০৭ সালের শেষের দিকে বার্সেলোনার ড্রেসিংরুমে এই ঐতিহাসিক ছবিটি তুলেছিলেন ফটোসাংবাদিক জোয়ান মনফোর্ট।

ছবির পেছনের মূল গল্প

২০০৭ সালে স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক ডিয়ারিও স্পোর্ট এবং জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ যৌথভাবে একটি চ্যারিটি ক্যালেন্ডার তৈরির উদ্যোগ নেয়। এই দাতব্য ক্যালেন্ডারে বার্সেলোনার ফুটবলারদের সাথে স্থানীয় সাধারণ শিশুদের ছবি রাখার সিদ্ধান্ত হয়। শিশুদের নির্বাচিত করার জন্য কাতালোনিয়ার রোকো ফোন্ডা এলাকায় একটি চ্যারিটি র‍্যাফেল (লটারি) আয়োজন করা হয়েছিল।

ভাগ্যের কী অপূর্ব খেলা! সেই লটারিতে বিজয়ী হয় ইয়ামালের পরিবার। লটারির পুরস্কার হিসেবেই বার্সেলোনার তৎকালীন উদীয়মান ২০ বছর বয়সী তরুণ তারকা লিওনেল মেসির সাথে ছবি তোলার সুযোগ পায় ছোট্ট ইয়ামাল ও তাঁর পরিবার।

ছবিটির ভাইরাল হওয়া ও মহাকাব্যিক তাৎপর্য

বহু বছর ধরে এই ছবিটির কথা সবাই ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালীন ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই তাঁর ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে ছবিটি পোস্ট করে ক্যাপশন দেন: "দুই কিংবদন্তির শুরু"।

মুহূর্তের মধ্যে ছবিটি বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়ে যায়। ফুটবল ভক্তরা এটিকে অভিহিত করছেন ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর এবং অলৌকিক "ফুল সার্কেল" বা চক্রপূরণের গল্প হিসেবে। কারণ, ২০০৭ সালে যে লাজুক ২০ বছর বয়সী মেসি একটি প্লাস্টিকের গামলায় ৬ মাসের ইয়ামালকে গোসল করিয়েছিলেন, ঠিক ১৯ বছর পর ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে সেই ইয়ামালের স্পেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে মেসির আর্জেন্টিনা।

"মেসিও সেদিন জানতেন না কীভাবে গোসল করাতে হয়"

ফটোসাংবাদিক জোয়ান মনফোর্ট এক সাক্ষাৎকারে স্মরণ করেন সেই চমৎকার মুহূর্তটির কথা। তিনি বলেন, "মেসি ছিলেন ভীষণ লাজুক ও অন্তর্মুখী স্বভাবের। মাত্র ২০ বছরের এক তরুণের সামনে হুট করে প্লাস্টিকের বালতিতে অন্য একজনের ছয় মাসের শিশুকে এনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে মেসি নিজেও বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলেন, বুঝতেই পারছিলেন না কীভাবে বাচ্চাটিকে ধরবেন বা গোসল করাবেন! কিন্তু ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত কোমল রসায়ন তৈরি হয়।"

নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা অনন্য ইতিহাস

অনেকেই হয়তো জানেন না, 'লামিনে ইয়ামাল' আসলে তাঁর প্রথম নাম, এটি কোনো একক নাম নয়। তাঁর পুরো নাম মূলত তাঁর বাবা ও মায়ের পারিবারিক উপাধি মিলিয়ে রাখা হয়েছে—লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই ইবানা।

এই নামকরণের পেছনেও রয়েছে এক সুন্দর পারিবারিক কৃতজ্ঞতার গল্প। মুনির নাসরাউই যখন স্পেনে একদম নতুন এবং অত্যন্ত কঠিন জীবন পার করছিলেন, তখন 'লামিনে' এবং 'ইয়ামাল' নামের দুজন পরোপকারী ব্যক্তি তাঁকে আশ্রয় ও কাজ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুনির তাঁর প্রথম সন্তানের নাম রাখেন এই দুই হিতৈষীর নামে।

শিকড়ের প্রতি চিরন্তন শ্রদ্ধা

মা-বাবার ভিন্ন জাতীয়তা এবং স্পেনে বড় হওয়ার কারণে ইয়ামাল তিনটি দেশের হয়ে খেলার যোগ্য ছিলেন—স্পেন, মরক্কো এবং বিষুবীয় গিনি। শেষ পর্যন্ত তিনি স্পেনের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিলেও নিজের মা-বাবা এবং শিকড়কে কখনো ভুলে যাননি।

ঐতিহাসিক ৩০৪ উদযাপন: ইয়ামাল গোল করার পর দুই হাতের আঙুল দিয়ে '৩০৪' সংখ্যাটি প্রদর্শন করেন। এটি মূলত তাঁর বেড়ে ওঠার জায়গা এবং বাবা মুনিরের শহর রোকো ফোন্ডার পোস্টাল কোড (০৮৩০৪)-এর শেষ তিন ডিজিট। সুবিধাবঞ্চিত এই অঞ্চলের মানুষদের তিনি এই উদযাপনের মাধ্যমে সম্মানিত করেন।

বুট জোড়ায় দেশের পতাকা: ইয়ামাল যে ফুটবল বুট পরে মাঠে নামেন, সেখানে স্পেনের পতাকার পাশাপাশি তাঁর বাবার দেশ মরক্কো এবং মায়ের দেশ বিষুবীয় গিনির পতাকা খোদাই করা থাকে। মাঠে নামার সময় তিনি সবসময় তাঁর মা-বাবার এই দুই জন্মভূমিকে নিজের পায়ে ধারণ করেন।

নিয়তির অপূর্ব চক্রপূরণ

আজ প্রায় দুই দশক পর, সেই শিশুটিই এখন স্পেনের জার্সিতে বিশ্ব কাঁপানো ফুটবল সেনসেশন। আর তাঁর গর্বিত বাবা মুনির নাসরাউই যখন প্রায় ভুলে যাওয়া সেই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে লিখেছিলেন—"দুই কিংবদন্তির শুরু", তখন পুরো ফুটবল বিশ্ব এক অদ্ভুত রোমাঞ্চে শিউরে উঠেছিল।

নাইলন আর প্লাস্টিকের সেই ছোট্ট টব থেকে শুরু হওয়া গল্পটি আজ কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। ২০০৭ সালের ড্রেসিংরুমে প্লাস্টিকের গামলায় মেসির আলতো করে পানি ছিটিয়ে দেওয়া সেই শিশুটিই আজ বিশ্বমঞ্চে মেসির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ফুটবল ইতিহাস রাঙাতে পুরোপুরি প্রস্তুত!

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়