বাবুল আহমেদ, মানিকগঞ্জ

  ৬ ঘণ্টা আগে

আশি বছরেও অদম্য আত্মসম্মান

ভিক্ষা নয়, ভ্যান ঠেলে ক্ষুধার অন্ন খোঁজেন চানমতী

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

মাথায় রূপোলি চুল, চামড়ায় বয়সের গভীর ভাজ। যে বয়সে নাতি-নাতনিদের গল্প শুনিয়ে কিংবা বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে বিশ্রামে দিন কাটার কথা, সেই আশি বছর বয়সেও এক বৃদ্ধাকে লড়তে হচ্ছে জীবনযুদ্ধের কঠিন ময়দানে। তীব্র রোদে কিংবা ঝড়-বৃষ্টিতে ভারী ভ্যানগাড়ি ঠেলে মানিকগঞ্জ পৌরসভার অলিগলিতে সবজি বিক্রি করছেন চানমতী। ভিক্ষাবৃত্তির সহজ পথ মাড়িয়ে পরনির্ভরশীল না হয়ে, আত্মমর্যাদার এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছেন মানিকগঞ্জ পৌরসভার মেহেন্দীবাগ গ্রামের মৃত আফছের আলীর এই সহধর্মিণী।

চার দশকের একাকী দীর্ঘ সংগ্রাম: চানমতীর জীবনসংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাবার অভাবের সংসার থেকে এসে পড়েন দিনমজুর স্বামীর ঘরে। সেখানেও পিছু ছাড়েনি চরম অভাব-অনটন। এর মধ্যেই কোলজুড়ে আসে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সংসারের চাকা যখন কোনো রকমে ঘুরছিল, তখনই নেমে আসে ঘোর অমাবস্যা; অসুস্থ হয়ে পড়েন স্বামী। প্রায় ৪০ বছর আগে স্বামীকে হারিয়ে তিন ছোট সন্তানকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন তিনি। সন্তানদের মুখে অন্ন জোগাতে শুরু করেন অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ, কখনো বা তপ্ত রোদে মাটি কাটার কঠোর পরিশ্রম।

হাঁকডাক আর ভাঙা ভ্যানের গল্প: সন্তানরা বড় হলেও দুঃখের অবসান ঘটেনি তাঁর। প্রায় ২৫ বছর আগে সন্তানদের মুখে দুবেলা দুমুঠো ভাত তুলে দিতে শুরু করেন ফেরি করে সবজি বিক্রির কাজ। দুই যুগ ধরে উত্তর সেওতা, গঙ্গাধরপট্টি ও পোড়রা এলাকায় দুই চাকার ভ্যানগাড়ি ঠেলে মাঝেমধ্যে হাঁকডাক ছেড়ে বলেন, "সবজি লাগব... সবজি?"। বর্তমানে দুই ছেলের একজন ঝালমুড়ি বিক্রি করে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন এবং ছোট ছেলে অটোরিকশা চালিয়ে নিজের সংসার সামলান। ভাঙা ভ্যান আর সামান্য পুঁজি নিয়ে পৈতৃক ভিটার এক কোণে ছোট ছেলের সংসারে থেকেই নিজের অন্নসংস্থান করছেন এই লড়াকু জননী।

প্রতিবেশীদের চোখে চানমতী এক অনন্য উদাহরণ: চানমতীর এই সততা ও কঠোর পরিশ্রম ছুঁয়ে গেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মন। সেওতা এলাকার গৃহবধূ লিবিয়া খানম আল্পনা বলেন, “বৃদ্ধা চানমতীর কাছ থেকে আমি সব সময় সবজি কিনি। তাঁর ভ্যানগাড়িটা ভাঙা, পুঁজিও খুব সামান্য। কিন্তু এই বয়সেও তিনি কারও কাছে হাত না পেতে কাজ করে খাচ্ছেন, এটা সত্যিই সম্মানের। সরকারি বা বেসরকারিভাবে তাঁকে একটু সহযোগিতা করলে এই কষ্ট কিছুটা কমত।”

একই সুর শোনা গেল গঙ্গাধরপটি এলাকার বাসিন্দা মোশারফ হোসেনের কণ্ঠে। তিনি বলেন, “চানমতীর বয়সী অনেকেই এখন ভিক্ষা করেন। কিন্তু তিনি তা না করে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছেন। বয়সের ভারে তাঁর কষ্ট হলেও তিনি পরনির্ভরশীলতার বিরুদ্ধে এক জ্বলন্ত উদাহরণ।”

ক্ষুধার কষ্ট আর বৃদ্ধ মায়ের আকুতি: নিজের জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অবিরত জল ঝরে চানমতীর চোখে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, “স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের বাঁচাতে মানুষের বাড়ি কাজ করেছি, মাটি কেটেছি। সন্তানদের বিয়ে দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু তাদের নিজেদের সংসার চালাতেই টানাটানি। পেটের ক্ষুধা তো আর বয়স চেনে না! ক্ষুধা মেটাতে এই বয়সেও ভ্যান ঠেলতে হয়। এখন শরীর আর চলে না, আগের মতো সবজিও বিক্রি হয় না। তাও ছেলেরা নিজেদের সাধ্যমতো আমাকে দেখেশুনে রাখে।”

প্রশাসনের আশ্বাস: অসহায় অথচ আত্মমর্যাদাশীল এই মায়ের সংগ্রামী জীবনের কথা পৌঁছেছে প্রশাসনের কানেও। এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শেখ মেজবাহ উল সাবেরিন জানান, সমাজে চানমতীর মতো নারীরা লড়াইয়ের এক অনন্য প্রেরণা। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, চানমতীর সার্বিক খোঁজখবর নিয়ে জেলা প্রশাসকের সাথে আলোচনা করে তাঁকে দ্রুতই প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হবে।

একটি সভ্য সমাজে চানমতীর এই বোবা কান্না আর অদম্য লড়াই যেন শুধু একটি সংবাদ হয়ে না থাকে; বরং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এই মায়ের শেষ জীবনের দিনগুলো একটু স্বস্তিময় করার উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়