নিজস্ব প্রতিবেদক
ইউরোপের বাজারে বাড়ছে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের সম্ভাবনা

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্য আরও বিস্তৃতভাবে রপ্তানির বিশাল সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক খাদ্য আমদানিকারক ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ‘ইউনাইটেড ডাচ এক্সপোর্টার্স’ (ইউনিডেক্স)-এর অ্যাম্বাসেডর ও অ্যাডভাইজার ফোরকান হায়দার চৌধুরী। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই বেলজিয়ান নাগরিকের মতে, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং নিয়মিত বাজার-সংযোগ বাড়াতে পারলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে এই বাজারের আর্থিক মূল্য বছরে শত কোটি টাকারও বেশি।
শোবার ঘর থেকে ইউরোপের শীর্ষ নেটওয়ার্ক: ১৯৮৯ সালে রোল্যান্ড ইয়ানসেনের হাত ধরে একটি ছোট উদ্যোগ হিসেবে ইউনিডেক্সের যাত্রা শুরু হয়েছিল। শোবার ঘরে মাত্র একটি ফ্যাক্স মেশিন নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি আজ ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ এথনিক ফুড ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। ইয়ানসেনের পারিবারিক মসলা ব্যবসার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল। তাঁর বাবা ভারত থেকে তেজপাতা, জিরা, হলুদ ও মরিচসহ বিভিন্ন মসলা আমদানি করে নেদারল্যান্ডসে আনতেন এবং পরে সুরিনাম ও কুরাসাওসহ বিভিন্ন ডাচ অঞ্চলে রপ্তানি করতেন। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই ইউরোপে বসবাসরত অভিবাসীদের নিজস্ব খাদ্যপণ্যের চাহিদাকে লক্ষ্য করে ইউনিডেক্সের কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই দুটি খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে—প্রথমটি ‘এথনিক বাজার’, যেখানে বিভিন্ন দেশের গ্রোসারি ও বিশেষায়িত দোকানে পণ্য সরবরাহ করা হয়; আর দ্বিতীয়টি ‘মূলধারার খুচরা বাজার’, যেখানে বড় বড় সুপারমার্কেট ও রিটেইল চেইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খাদ্যপণ্য সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মেলবন্ধন: ফোরকান হায়দার চৌধুরী জানান, নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে ইউনিডেক্সের প্রতিষ্ঠাতা রোল্যান্ড ইয়ানসেনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এর আগে তিনি অন্য একটি বহুজাতিক কোম্পানির সিইও হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের অক্টোবরে তিনি ‘কি অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার (ইউরোপ)’ হিসেবে ইউনিডেক্সে যোগ দেন। কর্মদক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ পরবর্তীতে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ‘ডিরেক্টর অব সেলস’ পদের দায়িত্ব পান। তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠানটির সিইও আমাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন, যা এখনও অব্যাহত আছে। পারস্পরিক বিশ্বাসের এই পরিবেশই নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।”
বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী সরবরাহ নেটওয়ার্ক: হেলসিঙ্কি থেকে মাল্টা পর্যন্ত বিস্তৃত বাজারে ইউনিডেক্সের শক্তিশালী সরবরাহ নেটওয়ার্ক রয়েছে। তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ড্রাই ফুড, পানীয় এবং হিমায়িত খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করে ইউরোপে সরবরাহ করছে। পশ্চিম আফ্রিকার ঘানা, নাইজেরিয়া, আইভরি কোস্ট ও সেনেগাল থেকে পাম অয়েল, পাম ক্রিম, কাসাভা ও বিভিন্ন ধরনের ফ্লাওয়ার আমদানি করা হয়। এ ছাড়া নরওয়ে থেকে নোনতা মাছ (বাকালাও) এবং চীন থেকে তেলাপিয়া মাছ আমদানি করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিপণন করা হয়।
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি ব্র্যান্ড: ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রসারে ফোরকান হায়দার চৌধুরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁরই বিশেষ উদ্যোগে প্রাণ, বিডি ফুড, ইফাদ ও ড্যানিশসহ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পণ্য ইউনিডেক্সের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে পৌঁছাতে শুরু করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে হিমায়িত মাছ, বিভিন্ন ধরনের স্ন্যাকস এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্যও নিয়মিত আমদানি করা হচ্ছে। এই পণ্যগুলো এখন এশীয়দের গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপে বসবাসরত আরব, আফ্রিকান ও ইউরোপীয়দের মাঝেও সমাদৃত হচ্ছে।
নতুন সরবরাহকারী খুঁজে বের করতে তিনি নিয়মিত দুবাইয়ের ‘গালফ ফুড’, জার্মানির ‘আনুগা’, ফ্রান্সের ‘সিয়াল’ এবং থাইল্যান্ডের ‘থাইফেক্স’-এর মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় খাদ্য প্রদর্শনীগুলোতে অংশ নেন এবং সেখানে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন পরিদর্শন করে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন।
একীভূতকরণ ও নতুন দিগন্ত: সম্প্রতি ইউনিডেক্স ইউরোপভিত্তিক ‘এশিয়ান ফুড গ্রুপ’-এর সঙ্গে একীভূত হয়ে একটি বৃহত্তর ব্যবসায়িক গ্রুপ গঠন করেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির ক্রয়ক্ষমতা, সরবরাহব্যবস্থা এবং ইউরোপজুড়ে বাজার সম্প্রসারণের সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই কৌশলগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের উৎপাদকদের জন্য ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান।
সম্প্রতি বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ফোরকান হায়দার বলেন, বাংলাদেশের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা এবং এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় বাজারের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এ সময় বর্তমান সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন দেখা গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্যবসায়িক সাফল্যের মূল ভিত্তি হিসেবে ফোরকান হায়দার মানবিক সম্পর্ককে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি বিশ্বাস করেন, ব্যবসা শুধু চুক্তি বা আর্থিক লেনদেনের বিষয় নয়; পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সততা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পিডিএস/এমএইউ








































