মো. বাইজিদ শেখ

  ১১ ঘণ্টা আগে

মুক্তমত

রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও শ্রমবাজার সংস্কার

মধ্যরাতে ঢাকা বিমানবন্দরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের চোখে যে জল জমে থাকে, সেই জলের নাম আমরা দিয়েছি ‘রেমিট্যান্স’। প্রতি মাসে যে বিলিয়ন ডলার দেশে ঢোকে, তার প্রতিটি ডলারের পেছনে লুকিয়ে থাকে একেকটি নির্ঘুম রাত, একেকটি প্রবাসজীবনের নীরব সংগ্রাম। মালয়েশিয়ার নির্মাণ সাইটে রোদে পোড়া একজন শ্রমিক, সৌদি আরবের মরুভূমিতে ঘাম ঝরানো একজন যুবক, কিংবা ইতালির কোনো রেস্তোরাঁয় থালা ধোয়া একজন বাবা তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই আজ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সচল। অথচ যাদের ঘামে অর্থনীতি বাঁচে, তাদের অধিকাংশই দেশ ছাড়ার আগেই প্রতারণার শিকার হন, আর বিদেশের মাটিতে পা রাখার পর প্রায়ই খুঁজে পান না আইনি সুরক্ষার ছায়া।

সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে যে সিন্ডিকেটের কথা সংবাদমাধ্যমে বারবার ওঠে এসেছে যেখানে হাজার হাজার কর্মীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় আদায় করে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকটের প্রকাশ্য রূপ মাত্র। একজন কৃষকের ছেলে জমি বিক্রি করে, ধারদেনা করে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, আর দালালের মাধ্যমে ভুয়া ভিসা কিংবা অস্তিত্বহীন চাকরির প্রতিশ্রুতিতে সর্বস্বান্ত হন। এই মানুষগুলোর কান্না অর্থনীতির পরিসংখ্যানে ঠাঁই পায় না, অথচ তাদের রক্ত-ঘামের টাকাতেই দেশের রিজার্ভ স্ফীত হয়।

বাংলাদেশে প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য আইনি কাঠামো একেবারে অনুপস্থিত নয়। ঔপনিবেশিক আমলের Emigration Ordinance, ১৯৮২ রহিত করে প্রণীত ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩’ এ খাতের মূল আইন, যা নিরাপদ ও ন্যায়সঙ্গত অভিবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছিল এবং জাতিসংঘের অভিবাসী শ্রমিক অধিকার সনদের (১৯৯০) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি। এই আইনের অধীনে রিক্রুটিং এজেন্টদের লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক, অভিবাসন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট দলিলপত্র ও ছাড়পত্রের বিধান রাখা হয়েছে, আর অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশ পাঠানোর ক্ষেত্রে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধানও রয়েছে। আইনের ৩০ ধারায় সরকারকে অভিবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের কল্যাণে ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়, প্রশিক্ষণ ও পুনঃএকত্রীকরণ কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, আর নারী অভিবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতে সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও আছে। এর পাশাপাশি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও সেবা লিমিটেড (বোয়েসেল) এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও গড়ে তোলা হয়েছে সরকারি খরচে বিদেশে কর্মী পাঠানো এবং বিপদে পড়া প্রবাসীদের সহায়তা দেওয়ার জন্য।

প্রশ্ন হলো, কাগজে-কলমে এত শক্তিশালী একটি আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও কেন প্রতি বছর হাজার হাজার শ্রমিক প্রতারিত হন? উত্তরটা লুকিয়ে আছে প্রয়োগের দুর্বলতায়। লাইসেন্সবিহীন সাব-এজেন্ট বা দালালচক্রের বিরুদ্ধে মামলা হলেও বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। ভুক্তভোগী শ্রমিক ততদিনে হয়তো আবার বিদেশে চলে গেছেন জীবিকার তাগিদে, সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ পান না, আর মামলা ঝুলে থাকে। অন্যদিকে সরকারি পর্যায়ে জবাবদিহিতার ঘাটতি এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতার কারণে সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার সুযোগ থেকেই যাচ্ছে। শ্রম উইং ও দূতাবাসগুলোর জনবল-সংকট বিদেশে বিপদে পড়া শ্রমিকদের দ্রুত আইনি সহায়তা পাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা প্রায়ই রেমিট্যান্সকে শুধু সংখ্যা দিয়ে মাপি এ মাসে এত বিলিয়ন ডলার, গত বছরের তুলনায় এত শতাংশ বৃদ্ধি। কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে যে মানুষগুলো আছেন, তাদের জীবনের মূল্য কোনো সূচকে ধরা পড়ে না। একজন প্রবাসী শ্রমিকের সন্তান তার বাবাকে বছরের পর বছর ভিডিও কলের ওপারে দেখে বড় হয়। একজন প্রবাসী স্ত্রী স্বামীর অনুপস্থিতিতে একাই সংসার, সন্তান আর সমাজের চাপ সামলান। যে দেশের অর্থনীতি এই মানুষগুলোর আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ব শুধু রেমিট্যান্সের সংখ্যা উদযাপন করা নয় তাদের মর্যাদা, নিরাপত্তা আর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাও।

প্রথমত, ২০১৩ সালের আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর নিয়মিত তদারকি বাড়িয়ে, লাইসেন্সবিহীন দালালচক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত বিচার আদালতের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, অভিবাসন ব্যয়ের একটি স্বচ্ছ, সরকার-নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা কার্যকরভাবে মনিটর করতে হবে, যাতে কেউ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলে তাৎক্ষণিক অভিযোগ ও প্রতিকারের সুযোগ থাকে। তৃতীয়ত, বিদেশে অবস্থিত শ্রম উইং ও দূতাবাসগুলোতে আইনি সহায়তা সেল শক্তিশালী করে জনবল ও বাজেট বাড়াতে হবে, যাতে বিপদগ্রস্ত শ্রমিক দ্রুত সাড়া পান। চতুর্থত, নারী গৃহকর্মীদের জন্য দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোতে ন্যূনতম মজুরি, বিশ্রামের অধিকার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রতিকার-প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সবশেষে, মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটের মতো বড় দুর্নীতির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে জনগণের আস্থা ফেরাতে হবে।

প্রবাসী শ্রমিকেরা কোনো করুণার পাত্র নন তারা এই দেশের অর্থনীতির নীরব স্থপতি। তাদের জন্য প্রণীত আইন যদি শুধু বইয়ের পাতায় বন্দি থাকে, তবে প্রতিটি রেমিট্যান্সের ডলারের সঙ্গে মিশে থাকা কান্নার দায় রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে। আইন আছে, প্রয়োজন শুধু তার প্রতি সদিচ্ছা আর দৃঢ় বাস্তবায়ন। যেদিন একজন প্রবাসী শ্রমিক নিরাপদে, মর্যাদা নিয়ে দেশ ছাড়তে ও ফিরতে পারবেন, সেদিনই প্রকৃত অর্থে রেমিট্যান্স হয়ে উঠবে গর্বের প্রতীক কেবল পরিসংখ্যানের নয়, মানবিকতারও।

লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়