reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১ ঘণ্টা আগে

ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ছাত্র আন্দোলন, সংহতি প্রবাসীদেরও

ভারতে চলমান ছাত্র আন্দোলন রাজধানী দিল্লি ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের কঠোর অবস্থানের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এ আন্দোলনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ অংশ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ভারতীয়রাও আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ করেছেন।

মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল দিল্লির যন্তর মন্তর। কিন্তু বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে এই বিক্ষোভ আর রাজধানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম এবং জবাবদিহির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন কার্যত সর্বভারতীয় রূপ নিয়েছে। খবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর।

দিল্লির রাজপথে শুরু হওয়া এই ক্ষোভ কয়েক দিনের মধ্যেই উত্তর, পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের একের পর এক শহরে ছড়িয়ে যায়। কোথাও ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান, কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, কোথাও আবার গণআটক- সব মিলিয়ে আন্দোলনটি দিল্লির মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ নেই। সেই বিস্তারের প্রথম বড় ছবি দেখা যায় বিহারের রাজধানী পাটনায়।

দিল্লির বাইরে সবচেয়ে নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয় বিহারের রাজধানী পাটনায়। বিক্ষোভে হাজার হাজার ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থী অংশ নেন। গান্ধী ময়দান থেকে রাজভবনের দিকে মিছিল এগোলে পুলিশ বাধা দেয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হয় এবং জলকামান ব্যবহার করা হয়।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বহু আন্দোলনকারী আহত হন। প্রশাসন অবশ্য দাবি করেছে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করে একটি ভাইরাল ভিডিও, যেখানে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে বাহিনীকে কড়া নির্দেশ দিতে দেখা যায়। সেই ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিরোধীরা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, প্রশ্ন ফাঁসের কারণে লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং সেই ক্ষোভই পাটনার রাজপথে বিস্ফোরিত হয়েছে।

গুজরাট: গুজরাটে আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে আহমেদাবাদ। ২০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া সংহতি কর্মসূচি ২২ জুলাই আরও বড় আকার নেয়। আহমেদাবাদের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রছাত্রী ও রাজনৈতিক কর্মীরা বিক্ষোভে অংশ নেন। বহু কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, একাধিক অভিযানে মোট দুই শর বেশি আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়। শুধু আহমেদাবাদ নয়, সুরাট ও ভাবনগরেও প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়।

বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, পরিশ্রম করে পড়াশোনা করা ছাত্রদের ভবিষ্যৎ বারবার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের দাবি, শুধু তদন্ত নয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে।

মহারাষ্ট্র: মহারাষ্ট্রে আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ছিল মুম্বইয়ের শিবাজি পার্ক। ২২ জুলাই প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ সেখানে জড়ো হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি অভিনেতা, কৌতুকশিল্পী, সামাজিককর্মী এবং সাধারণ মানুষও উপস্থিত ছিলেন।

পুলিশের দাবি, প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া কর্মসূচি হওয়ায় প্রায় ২০০ জনকে আটক করা হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভেও প্রশাসন অযথা কড়াকড়ি করেছে। এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেই বলিউড অভিনেতা সালমন খান প্রকাশ্যে ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, প্রশ্ন ফাঁস অত্যন্ত গুরুতর সমস্যা।

নাগপুর: মহারাষ্ট্রের দ্বিতীয় বড় কেন্দ্র ছিল নাগপুর। বুধবার গভীর রাতে সম্বিধান স্কোয়ারে আন্দোলনকারীরা নির্ধারিত সময়ের পরেও অবস্থান চালিয়ে গেলে পুলিশ অভিযান শুরু করে। বহু বিক্ষোভকারীকে পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার সময় কয়েকজন আন্দোলনকারী জাতীয় সংগীত গাইতে শুরু করেন। সেই ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশ জুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। পুলিশ জানায়, অনুমোদিত সময়সীমা অতিক্রম করায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রশাসন অহেতুক শক্তি প্রদর্শন করেছে।

কলকাতা: দিল্লির আন্দোলনের প্রতিধ্বনি পৌঁছেছে পশ্চিমবঙ্গেও। ২২ জুলাই কলকাতার যাদবপুর, কলেজ স্ট্রিটসহ একাধিক এলাকায় ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সংহতি মিছিল করেন। যাদবপুরে কয়েকশ মানুষ মিছিলে অংশ নেন বলে আয়োজকদের দাবি।

বক্তাদের বক্তব্য ছিল, প্রশ্ন ফাঁস কোনো একটি রাজ্যের সমস্যা নয়; এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে জড়িত। তাই দিল্লিতে যা ঘটছে, তার প্রভাব দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর উপর পড়ছে।

কলকাতার কর্মসূচিগুলো মূলত শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে বক্তারা যন্তর মন্তরে পুলিশি পদক্ষেপ, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের অভিযোগ এবং আন্দোলনকারীদের উপর বলপ্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

আসাম: উত্তর-পূর্ব ভারতে আন্দোলনের সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র দেখা যায় আসামে। গোয়ালপাড়ায় ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখান। হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে তারা শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি তোলেন। আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি ছিল প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। গুয়াহাটিতেও সংহতি কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক গোষ্ঠী দিল্লির আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। আসামের পাশাপাশি মণিপুর ও মিজোরামেও ছোট ছোট সংহতি কর্মসূচির খবর সামনে আসে। এতে স্পষ্ট হয় যে আন্দোলনের প্রভাব উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু অংশে পৌঁছে গিয়েছে।

কর্নাটক: বেঙ্গালুরুতে আন্দোলনের চরিত্র ছিল কিছুটা আলাদা। এখানে শুধু ছাত্রছাত্রীরাই নয়, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া চাকরিপ্রার্থী এবং তরুণ পেশাজীবীরাও কর্মসূচিতে অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, প্রশ্ন ফাঁসের ফলে মেধা ও পরিশ্রমের মূল্য কমে যায়। বহু পরীক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন, কিন্তু অনিয়মের কারণে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর না থাকলেও আন্দোলনের বার্তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

তেলেঙ্গানা: হায়দরাবাদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একাধিক ছাত্র সংগঠন বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের আয়োজন করে।

আন্দোলনকারীরা বললেন, প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘটনা দেশের উচ্চশিক্ষা ও চাকরির পরীক্ষার উপর মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। তাই শুধু প্রশাসনিক তদন্ত নয়, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারও জরুরি। বিক্ষোভকারীরা দিল্লির আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে স্মারকলিপি জমা দেন।

কেরল: কেরলের বিভিন্ন জেলায় ছাত্রসংগঠনগুলো শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। কোথাও মানববন্ধন, কোথাও মোমবাতি মিছিল, আবার কোথাও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ছাত্রসংগঠনগুলোর বক্তব্য ছিল, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা। তাই দ্রুত বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

তামিলনাড়ু: চেন্নাই ও তামিলনাড়ুর অন্য কয়েকটি শহরেও প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়। বহু শিক্ষার্থী বলেন, দেশের যেকোনো অংশে পরীক্ষার অনিয়ম হলে তার প্রভাব সর্বত্র পড়ে, কারণ জাতীয় স্তরের পরীক্ষাগুলোতে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। ছাত্রসংগঠনগুলো শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি তোলে এবং দিল্লির আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়।

উত্তরপ্রদেশ: লখনৌয়ে ছাত্রসংগঠন ও চাকরিপ্রার্থীরা আন্দোলনের সমর্থনে রাস্তায় নামেন। তাদের দাবি, নিয়োগ ও পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং ভবিষ্যতে প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যদিও উত্তরপ্রদেশে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল, তবুও ছাত্রসমাজের ক্ষোভ স্পষ্টভাবে সামনে আসে।

চণ্ডীগড় ও পাঞ্জাব: চণ্ডীগড় ও পাঞ্জাবের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রসংগঠনগুলো সংহতি কর্মসূচি পালন করে। অনেকেই বলেন, দিল্লির আন্দোলন এখন আর শুধু রাজধানীর বিষয় নয়; এটি গোটা দেশের শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের প্রতিফলন।

আদালত, রাজনীতি ও জাতীয় বিতর্ক: আন্দোলন যত ছড়িয়েছে, ততই রাজনৈতিক চাপও বেড়েছে। দিল্লি হাইকোর্ট পুলিশি বলপ্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে কেন্দ্র ও দিল্লি পুলিশকে নোটিস দিয়েছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। এদিকে সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিরোধীরা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিরোধী নেতা আন্দোলনকারীদের সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে সরকার বলছে, প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দ্রুত বিচারের জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়