সংস্কারের হাওয়া
বিনিয়োগে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটুক

দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে শিল্প সম্প্রসারণ, নতুন কারখানা, বিনিয়োগবান্ধব আইন, ডিজিটাল সেবা, কর সুবিধা, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষে সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলে আগামী কয়েক বছরে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল নীতিগত ঘোষণা দিয়ে বিনিয়োগ আসে না। বিনিয়োগ আসে তখনই, যখন বিনিয়োগকারীরা নিশ্চিত হন যে নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে, প্রশাসনিক জটিলতা কমবে, আর্থিক খাত স্থিতিশীল হবে এবং প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবে কার্যকর হবে।
বলা সংগত, বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যদি সরকার ঘোষিত সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে দেশীয় ও বিদেশি, উভয় ধরনের বিনিয়োগই উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। আর বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের পথও আরো শক্তিশালী হবে। আমরা মনে করি, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার পর বাংলাদেশে আবারও বিনিয়োগ নিয়ে আশাবাদ তৈরি হতে শুরু করেছে। গত দেড় বছরের টালমাটাল পরিস্থিতির পর নতুন সরকারের ধারাবাহিক নীতিগত সিদ্ধান্ত, ব্যবসা সহজীকরণের উদ্যোগ, শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষে একের পর এক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ গঠন, একক ডিজিটাল সেবার ব্যবস্থা, লাইসেন্স ও কোম্পানি নিবন্ধনের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা, নতুন শিল্পনগরী ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল এবং ৬০ হাজার কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজ; সব মিলিয়ে সরকার বিনিয়োগকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলার যে রূপরেখা দিয়েছে, তা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন পর সরকারের নীতিতে বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে কেবল ঘোষণা নয়, এসব উদ্যোগের দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে এই আস্থা কতটা টেকসই হবে। তবে প্রাসঙ্গিকতায় বলতে হচ্ছে, দেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত এখন বড় ধরনের পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ছয় মাসে ১০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে। বিভিন্ন শিল্প সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, এতে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। একই সময়ে অন্তত ৫০টি কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। তবে এই নেতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি আরেকটি ইতিবাচক প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে প্রায় ৭০টি নতুন কারখানা চালু হয়েছে বা উৎপাদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব কারখানায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, নতুন বিনিয়োগের ধরনও বদলাচ্ছে। আগে যেখানে সাধারণ পোশাক উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব ছিল, এখন সেখানে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, ম্যান-মেইড ফাইবার, উচ্চমূল্যের অ্যাকসেসরিজ, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং আমদানি বিকল্প শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ছে।
বলা বাহুল্য, বিদেশি বিনিয়োগের চেয়ে দেশীয় বিনিয়োগই বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে দেশীয় বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগের অবদান এখনো এক শতাংশেরও অনেক নিচে। তাই দেশীয় উদ্যোক্তারা যখন নতুন কারখানা, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সম্প্রসারণে এগিয়ে আসবেন, তখন সেটিই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী ইতিবাচক বার্তা হিসেবে কাজ করবে। যার ফলে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ভাবেও স্বাবলম্বী হবে দেশ। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
"






































