বিডার উদ্যোগ
শত কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ বাস্তবায়নের পথে

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কৌশলগত উদ্যোগ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালে গড়ে তোলা প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইনের মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ ইতোমধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) প্রকাশিত বিডার এক ধারণাপত্রে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিডা বলছে, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ, বিনিয়োগ-পরবর্তী সহায়তা, নীতিগত সমন্বয় এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করার ফলেই এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। সংস্থাটির আশা, চলমান এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতে দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ আরও বাড়বে এবং শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রফতানি বহুমুখীকরণে নতুন গতি আসবে।
বিডা জানায়, ২০২৫ সালে ২০ দেশের ৭০ জন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীকে সম্পৃক্ত করে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিনিয়োগ পাইপলাইন গড়ে তোলা হয়। এরই মধ্যে ১৫ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ ‘সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন’ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিনিয়োগের প্রধান উৎস দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, চীন, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস এবং দক্ষিণ কোরিয়া।
ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, শুধু বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি সংগ্রহ করাই নয়, সম্ভাব্য বিনিয়োগকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার জন্য বিডা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন, নীতিগত সহায়তা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিনিয়োগগুলোর একটি এসেছে হংকংভিত্তিক হ্যান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড থেকে। বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২৫-এ প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল। পরে বিডা, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) ধারাবাহিক সহায়তা ও সমন্বয়ের ফলে প্রতিষ্ঠানটি তাদের বিনিয়োগ দ্বিগুণ করে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করে।
এই প্রকল্পের প্রথম ধাপে মিরসরাই বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে একটি আধুনিক সেলাই ও পোশাক উৎপাদন কারখানার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এতে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। দ্বিতীয় ধাপে কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে সমন্বিত টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল উৎপাদন কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে। এতে আরও প্রায় ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে, যা দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহৎ একক বৈদেশিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিডা বলছে, হ্যান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজের বিনিয়োগ শুধু মূলধন আনবে না, বরং আন্তর্জাতিক মানের উন্নত বস্ত্র উৎপাদন প্রযুক্তিও বাংলাদেশে স্থানান্তর করবে। এর ফলে উচ্চমূল্যের কাপড় ও পোশাক উৎপাদন বাড়বে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।
চীনের শানডং হেনগলি টেক্সটাইল টেকনোলজির সহযোগী প্রতিষ্ঠান লিড বাংলাদেশ টেক্সটাইল টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেডও বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করছে। প্রায় ১২ দশমিক ৬ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে অত্যাধুনিক বস্ত্র উৎপাদন কারখানা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মানের উন্নত টেক্সটাইল উৎপাদন প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা চালু হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় বস্ত্র শিল্পের মূল্য সংযোজন বাড়বে, আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং দেশীয় কর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা সম্ভব হবে।
শ্রীলঙ্কার সফটলজিক লাইফ ইন্স্যুরেন্সও বাংলাদেশের আর্থিক খাতে নতুন দিগন্তের সূচনা করতে যাচ্ছে। প্রায় ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠানটি ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ৬০ শতাংশ মালিকানা অধিগ্রহণ করছে। বিডার সহায়তায় সম্পন্ন হওয়া এই চুক্তিকে দেশের জীবন বিমা খাতে প্রথম বড় বৈদেশিক বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, শতভাগ ডিজিটাল বিমা আবেদন এবং একদিনে বিমা দাবি নিষ্পত্তির মতো আধুনিক প্রযুক্তি দেশে নিয়ে আসবে।
এদিকে চীনের লেসো গ্রুপ বাংলাদেশে ৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে একটি উৎপাদন কারখানা স্থাপন করছে। চট্টগ্রামের ন্যাশনাল স্পেশাল ইকোনমিক জোনে ১২ দশমিক ৫ একর জমির ওপর নির্মিতব্য এই কারখানায় উন্নতমানের পাইপ, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম, স্যানিটারি সামগ্রী, বৈদ্যুতিক পণ্য, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন করা হবে। এর মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমবে, স্থানীয় শিল্প শক্তিশালী হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মালয়েশিয়ার খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান মি. ডিআইওয়াইও বাংলাদেশে দ্রুত কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে। বিডা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় শাখা বিস্তার করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ১৭টির বেশি মেগা স্টোর চালু রয়েছে, যেখানে প্রায় ১৭ হাজারের বেশি পণ্য বিক্রি হচ্ছে। বিডা বলছে, এই সম্প্রসারণ দেশীয় খুচরা বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক এভিয়েশন খাতের অনবোর্ড সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মেগারিচ বাংলাদেশে প্রায় ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিমানযাত্রীদের ব্যবহৃত ট্রাভেল কিট, ব্যাগ, আই মাস্ক, স্লিপারসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করবে। এসব পণ্য বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন বিমান সংস্থায় রফতানি করা হবে। বিডার মতে, এই বিনিয়োগ দেশের প্রচলিত তৈরি পোশাক খাতের বাইরে রফতানি বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ধারণাপত্রে বিডা জানিয়েছে, গত ১২ থেকে ১৫ মাসে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইন থেকে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ বাস্তবায়ন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে পৌঁছানো অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে বিনিয়োগকারীদের জন্য খাতভিত্তিক ও দেশভিত্তিক বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ২০২৬ সালে নতুন করে আরও ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ পাইপলাইনে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিশেষায়িত বিনিয়োগ ডেস্ক, নিবেদিত টিম এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাস্তবায়নের হার আরও বাড়ানো যায় এবং দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হয়।









































