নাহিদ হাসান রবিন
মতামত
মহাসড়কে আর কত রক্তে ভেজবে পিচ?

প্রতিটি সকাল যখন খবরের কাগজের পাতা কিংবা সামাজিক মাধ্যমের দেয়ালে চোখ মেলে, তখন এক বুক আতঙ্ক এসে ভর করে। কোনো না কোনো প্রান্তে তখন পিচঢালা কালো রাস্তা লাল হয়ে আছে মানুষের তাজা রক্তে। সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর কেবল কোনো আকস্মিক বিপর্যয় বা নিয়তি নির্ধারিত দুর্ভাগ্য নয়; এটি রূপ নিয়েছে এক নীরব ও নির্মম মহামারিতে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের বার্ষিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, আর পঙ্গুত্ব বরণ করছে তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি। একটি দুর্ঘটনা মানে শুধু একটি প্রাণ হারিয়ে যাওয়া নয়, একটি সচল পরিবারের চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাওয়া, একজোড়া চোখের স্বপ্ন নিভে যাওয়া। ঘর থেকে বের হলে সুস্থ শরীরে আবার চেনা বারান্দায় ফিরে আসা যাবে কি না, এই অনিশ্চয়তা নিয়ে প্রতিদিন কোটি মানুষ ঘর ছাড়ে। এই মৃত্যুকূপ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের খোলনলচে বদলে ফেলতে হবে। সড়ককে নিরাপদ করার গুরুদায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের কাঁধে বর্তায়, তেমনি দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজেদের দায়ও কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। দুই পক্ষের সম্মিলিত সদিচ্ছা আর কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া এই মহাসড়কের মৃত্যুমিছিল থামানো অসম্ভব।
আমাদের দেশের সড়কগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, এগুলো যেন একেকটি অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে কোনো ঘোষণা ছাড়াই প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। চাকার নিচে পিষ্ট হচ্ছে শৈশব, তরুণ শিক্ষার্থীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কিংবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি। এই সংকটের পেছনে চালকদের বেপরোয়া মনোভাব এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। মহাসড়কগুলোতে যখন দুটি দূরপাল্লার বাস একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে, তখন মনে হয় যেন দুটো ক্ষুধার্ত হিংস্র হায়েনা শিকারের খোঁজে উন্মত্ত হয়ে দৌড়াচ্ছে। তাদের এই গতির নেশা আর ওভারটেকিংয়ের চশমখোর মানসিকতার বলি হতে হয় সাধারণ যাত্রীদের। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন। যেসব গাড়ি স্ক্র্যাপ বা ভাঙাড়িতে থাকার কথা, সেগুলো বুক ফুলিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রধান সড়কগুলোতে। ব্রেক ফেল হওয়া, হেডলাইট না থাকা, কিংবা ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিন নিয়ে রাস্তায় নামা এই যানবাহনগুলো একেকটি চলন্ত টাইমবোমা, যা কখন কাকে উড়িয়ে দেবে কেউ জানে না।
এ সমস্যার শেকড় আরো গভীরে প্রোথিত। আমাদের দেশে চালক তৈরির প্রক্রিয়াটিই এক বড় গলদে ভরা। ওস্তাদের কাছ থেকে গাড়ি চালানো শিখে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই হাজার হাজার তরুণ চালকের আসনে বসে পড়ছে। লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে যে কঠোরতা এবং সততা থাকা দরকার, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে তা অনেক সময়ই লোপ পায়। ফলে অলীক এক কাগজ হাতে পেয়ে অদক্ষ, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও মাদকাসক্ত চালকেরা যখন ভারী যানবাহনের স্টিয়ারিং ধরে, তখন সড়ক নিরাপদ থাকার সব আশাই গুড়ে বালি। পাশাপাশি, সড়কের জনারণ্যে যোগ হয়েছে কাঠামোগত বিচারহীনতার সংস্কৃতি। বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন কাগজে-কলমে সংস্কার করা হলেও এর ফাঁকফোকর গলে এবং রাজনৈতিক বা শ্রমিক সংগঠনের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যায় মূল অপরাধীরা। মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব বেপরোয়া চালকদের মনে এই ধারণাই গেথে দিয়েছে যে, রাস্তায় মানুষ মারলে পার পাওয়া কঠিন কিছু নয়। এই বিচারহীনতাই অপরাধের পথকে আরো মসৃণ করে তুলছে।
একইসঙ্গে আমাদের নগরায়ন ও সড়ক ব্যবস্থাপনার বৈষম্য এই সংকটকে আরো তীব্র করেছে। ফুটপাতগুলো আজ পথচারীদের হাঁটার উপযোগী নেই, সেগুলো দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ দোকানপাট, রাজনৈতিক কার্যালয় কিংবা হকারদের রাজত্ব। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ হাটবাজার ও নসিমন-করিমনের মতো ধীরগতির অননুমোদিত যান চলাচলের কারণে গতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। অপরিকল্পিত বাঁক, অন্ধ গলি, এবং ব্ল্যাক স্পট বা দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো বছরের পর বছর ধরে একই অবস্থায় পড়ে আছে। যেন এক একটি মরণফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে, আর চালকেরা একটু অসতর্ক হলেই সেই ফাঁদে আটকা পড়ছে আস্ত একটা গাড়ি।
তবে সব দোষ শুধু চালক বা প্রশাসনের ওপর চাপালে আমাদের নিজেদের আত্মপ্রবঞ্চনা করা হবে। নাগরিক হিসেবে জনগণের সচেতনতার অভাব এবং আইন অমান্য করার এক মজ্জাগত প্রবণতা এই সংকটকে আরো ঘনিভূত করেছে। ফুটওভার ব্রিজ কিংবা আন্ডারপাস থাকতেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে হাত উঁচিয়ে রাস্তা পার হওয়ার দৃশ্য আমাদের নিত্যদিনের। এই যেন যমরাজকে ইশারায় ডেকে বলা- আমি আসছি, আমায় নিয়ে যাও। জেব্রা ক্রসিংয়ের তোয়াক্কা না করে যেখানে-সেখানে গাড়ি থামানো, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলা কিংবা কানে হেডফোন গুঁজে রেললাইন ও সড়ক পার হওয়া এক আত্মঘাতী বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। মোটরবাইক আরোহীদের হেলমেট না পরার প্রবণতা এবং ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে উল্টো পথে গাড়ি চালানো এখন এক সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। শৃঙ্খলাকে আমরা দাসত্ব মনে করি, আর আইন ভাঙাকে মনে করি বীরত্ব; এই মানসিকতাই আমাদের সড়কের সবচেয়ে বড় শত্রু। এই অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে হলে সরকারকে নিতে হবে এক ইস্পাতকঠিন ও আপসহীন ভূমিকা। সবার আগে প্রয়োজন আইনের নিরেট শাসন প্রতিষ্ঠা করা। ট্রাফিক আইন খাতায়-কলমে যতই শক্তিশালী হোক, তার প্রয়োগ যদি শিথিল হয় তবে তা কাগজের বাঘ ছাড়া আর কিছুই নয়। আইন অমান্যকারী, লাইসেন্সবিহীন ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির মালিক ও চালকদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। জরিমানা এবং শাস্তির বিধান এমন দৃষ্টান্তমূলক হওয়া উচিত যাতে আইন ভাঙার সাহস কেউ না পায়। লাইসেন্স প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াটিকে ডিজিটাল এবং শতভাগ স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে কোনো অদক্ষ ব্যক্তি টাকার জোরে বা তদবিরের সুবাদে রাস্তায় নামার ছাড়পত্র না পায়। এ ছাড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগকে অবিলম্বে ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা ও বিপজ্জনক বাঁকগুলো সংস্কার করতে হবে। মহাসড়কে ধীরগতির যান এবং
দ্রুতগতির যানের জন্য পৃথক লেনের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও মামলা প্রথা চালু করলে চালকদের মধ্যে গতিসীমা মেনে চলার এক বাধ্যবাকতা তৈরি হবে।
সরকারকে একইসঙ্গে সড়কের চারপাশ এবং ফুটপাত অবমুক্ত করার কঠোর অভিযান পরিচালনা করতে হবে। ফুটপাত পথচারীদের ফিরিয়ে দেওয়া এবং মহাসড়কের ধারের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি সড়ক সুরক্ষার প্রাথমিক শর্ত। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর ভেতর থেকেও শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। শুধু মুনাফার পেছনে না ছুটে চালকদের কর্মঘণ্টা সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া প্রয়োজন। একজন ক্লান্ত, ঘুমহীন চালকের হাতে কয়েকশো যাত্রীর জীবন সঁপে দেওয়া আর জেনেশুনে বিষপান করা একই কথা। চালকদের নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পেশাদারত্ব বাড়াতে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে। গণপরিবহন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বড় এবং মানসম্মত বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে। যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী তোলার যে বিশৃঙ্খলা, তা বন্ধ করে নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ এবং টিকিট ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা জরুরি। রেল ও নৌপথকে আরো আকর্ষণীয় এবং সাশ্রয়ী করে তুলতে পারলে সড়কের ওপর থেকে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ অনেকটাই কমে আসবে, যা পরোক্ষভাবে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে বড় ভূমিকা রাখবে। কিন্তু সরকারের এই সমস্ত আয়োজন ভেস্তে যাবে যদি দেশের জনগণ নিজেদের স্বভাব না বদলায়। আত্মসচেতনতাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় সুরক্ষাকবচ। রাস্তা পারাপারের সময় ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করা এবং ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলাকে আমাদের অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি পরিবার থেকে সড়ক সচেতনতার প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া উচিত, যাতে তারা বড় হয়ে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হতে পারে। গাড়িতে চড়ে চালককে দ্রুত যাওয়ার জন্য চাপ না দিয়ে, বরং তাকে সাবধানে গাড়ি চালাতে বাধ্য করা প্রতিটি যাত্রীর নাগরিক দায়িত্ব। কোনো চালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালালে সম্মিলিতভাবে তার প্রতিবাদ করতে হবে। আমরা যদি নিজে থেকে নিয়ম মানতে শুরু করি, তবে সমাজ ও রাষ্ট্রও সেই নিয়মের সুফল পেতে বাধ্য। আইনকে ভয় পেয়ে নয়, নিজের ও অন্যের জীবনের মূল্য অনুধাবন করে আমাদের সুনাগরিকের পরিচয় দিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি জীবন্ত অপমৃত্যু। নদী যেমন তার ভাঙনে তিলে তিলে গড়া জনপদ গ্রাস করে নেয়, তেমনি আমাদের অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার সড়কগুলো প্রতিদিন চুষে নিচ্ছে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মেধা ও শ্রম। এই রক্তক্ষরণ আর কতকাল চলবে? উন্নয়ন আর প্রগতির চাকা তখনই সার্থক হবে যখন সেই চাকার নিচে কোনো মানুষের পিষ্ট হওয়ার কান্না থাকবে না। সড়ককে নিরাপদ করতে হলে সরকারের কঠোরতা এবং জনগণের সচেতনতাকে একই সুতোয় গাথতে হবে। এটি কোনো একক পক্ষের যুদ্ধ নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার যৌথ লড়াই। আসুন, আর কোনো মায়ের কোল খালি হতে না দিই, আর কোনো শিশুকে এতিম না করি। নিরাপদ সড়ক হোক আমাদের অঙ্গীকার। একটি সুশৃঙ্খল ও শান্তিময় যাতায়াত ব্যবস্থা হোক আগামী প্রজন্মের জন্য আমাদের সবচেয়ে সুন্দর উপহার।
লেখক : কথাশিল্পী, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
"





































