হাবিবুর রহমান সাগর

  ১১ ঘণ্টা আগে

দৃষ্টিপাত

পরীক্ষার বাইরে যে শিক্ষার সংকট

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কিংবা সাম্প্রতিক বিভিন্ন শিক্ষা-সংক্রান্ত আন্দোলন- প্রতিবারই দেখা গেছে, যখন রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন রাজপথই তাদের শেষ আশ্রয় হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষা, বন্যা পরিস্থিতি এবং শিক্ষামন্ত্রীর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকট, প্রশাসনিক অদূরদর্শিতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি নীতিনির্ধারকদের সংবেদনশীলতার ঘাটতির একটি স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।

একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা শুধু পরীক্ষা গ্রহণ কিংবা ফল প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা হলো নাগরিক গঠনের প্রক্রিয়া, যেখানে শিক্ষার্থীর মানসিক সুস্থতা, নিরাপত্তা, সমতা, মানবিকতা এবং শেখার পরিবেশ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আমাদের বাস্তবতায় বারবার দেখা যায়, শিক্ষার্থীর চেয়ে পরীক্ষার সময়সূচি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যেন শিক্ষার্থীদের জীবন-বাস্তবতার সঙ্গে নয়, বরং একটি যান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচালিত হয়। সাম্প্রতিক ঘটনাও সেই চিত্রকেই আরো স্পষ্ট করেছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা, রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন, হাজারো পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে, শিক্ষার্থীদের বই-খাতা পানিতে ভেসে গেছে- এমন বাস্তবতায় পরীক্ষা স্থগিতের যৌক্তিক দাবি উঠেছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। পরে কর্তৃপক্ষ পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু তখন পর্যন্ত ক্ষোভ রাজপথে নেমে এসেছে। অর্থাৎ সংকটের মূল কারণ ছিল শুধু সিদ্ধান্ত নয়; বরং সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং সংকট মোকাবিলায় কার্যকর যোগাযোগের অভাব।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব হলো মানুষের কথা শোনা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠীর উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে অনেক শিক্ষার্থী মনে করেছেন, তাদের কথা শোনা হয়নি; বরং তাদের উদ্বেগকে হালকাভাবে দেখা হয়েছে। একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর যেকোনো মন্তব্য শুধু ব্যক্তিগত মত নয়; সেটি পুরো সরকারের মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের কষ্টের মুহূর্তে যদি কোনো বক্তব্য ব্যঙ্গাত্মক বা অসংবেদনশীল বলে প্রতীয়মান হয়, তবে তা ক্ষোভকে আরো বাড়িয়ে দেয়। পরে সংসদে ক্ষমা চাওয়া অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ, কিন্তু অনেক সময় ক্ষমার চেয়ে সময়োপযোগী সহমর্মিতা বেশি কার্যকর হয়।

তবে এই আন্দোলনের গভীরে আরো বড় একটি প্রশ্ন রয়েছে- বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কি ক্রমেই পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে? শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, চিন্তাশক্তি ও বাস্তবজ্ঞান বিকাশের পরিবর্তে পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে পাবলিক পরীক্ষা। বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ শেখার আনন্দ, গবেষণার সুযোগ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা কিংবা মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি।

বাংলাদেশে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন যেন এক পরীক্ষা থেকে আরেক পরীক্ষার যাত্রা। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক- প্রতিটি ধাপে পাবলিক পরীক্ষার চাপ, কোচিংনির্ভরতা এবং নম্বরের প্রতিযোগিতা তাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। এমন একটি ব্যবস্থায় পরীক্ষার সময়সূচি সামান্য পরিবর্তিত হলেও পুরো কাঠামো অস্থির হয়ে পড়ে। কারণ আমরা শিক্ষা নয়, পরীক্ষাকেই শিক্ষার সমার্থক করে ফেলেছি।

এ পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ে ভর্তি পদ্ধতি নিয়েও নতুন বিতর্ক সামনে এসেছে। লটারিভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থা পরিবর্তন করে পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা চালুর পরিকল্পনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষা যদি মৌলিক অধিকার হয়, তাহলে সেই অধিকারের প্রবেশদ্বার কি আবার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ওপর নির্ভর করবে? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, ভর্তি পরীক্ষা যত বাড়বে, কোচিং-বাণিজ্য তত বিস্তৃত হবে। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা অতিরিক্ত প্রস্তুতির সুযোগ পাবে, আর দরিদ্র ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা আরো পিছিয়ে পড়বে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি মৌলিক সংকট হলো নীতিনির্ধারণে অংশীজনদের সীমিত অংশগ্রহণ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষাবিদ কিংবা গবেষকদের মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে বাস্তবতার সঙ্গে নীতির দূরত্ব তৈরি হয়। একটি কার্যকর শিক্ষা সংস্কার কখনোই কেবল প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে সফল হতে পারে না; এটি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, পরীক্ষামূলক প্রয়োগ, অংশীজনের মতামত এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে।

বর্তমান সময়ে শিক্ষা সংস্কারের নামে যেসব উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যেও সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। কোথাও বিদেশি ভাষা বাধ্যতামূলক করার আলোচনা, কোথাও প্রত্যেক শিক্ষককে ট্যাব দেওয়ার পরিকল্পনা, আবার কোথাও নতুন বিষয় সংযোজনের প্রস্তাব- এসব উদ্যোগ আলাদাভাবে আকর্ষণীয় শোনালেও প্রশ্ন হলো, বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান কি আগে হয়েছে? দেশের সব বিদ্যালয়ে কি পর্যাপ্ত শিক্ষক রয়েছে? সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত হয়েছে? শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠদানের মান, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীর মৌলিক দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়গুলো কি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেছে? এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো পাওয়া যায় না।

শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান শিক্ষক। অথচ শিক্ষকতার পেশাগত মর্যাদা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট। একজন দক্ষ শিক্ষক ছাড়া কোনো পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তি কিংবা মূল্যায়ন পদ্ধতি সফল হতে পারে না। কিন্তু আমাদের আলোচনায় শিক্ষক নয়, বেশি গুরুত্ব পায় পরীক্ষা, প্রশ্নপত্র কিংবা ফলাফল।

মূল্যায়ন পদ্ধতিও নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। শিক্ষাবিজ্ঞান বলছে, একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত সক্ষমতা কেবল কয়েক ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষায় নির্ধারণ করা যায় না। ধারাবাহিক মূল্যায়ন, প্রকল্পভিত্তিক কাজ, উপস্থাপনা, দলীয় কার্যক্রম, সৃজনশীল সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও দক্ষতা অনেক বেশি কার্যকরভাবে মূল্যায়ন সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশ এরই মধ্যে সেই পথে এগিয়েছে। বাংলাদেশেও পাবলিক পরীক্ষার ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যালয়ভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়নের গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন। একইসঙ্গে পাবলিক পরীক্ষার পরিধিও পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।

শিক্ষা সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সংস্কার হতে হবে বাস্তবভিত্তিক, গবেষণানির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদি। প্রতিটি সিদ্ধান্তের আগে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, শিক্ষকের সক্ষমতা, শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বিবেচনায় নিতে হবে। সংস্কার যদি কেবল নতুন ঘোষণা কিংবা প্রশাসনিক উদ্ভাবনে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করতে পারবে না। আজ প্রয়োজন এমন একটি জাতীয় শিক্ষা-দর্শন, যেখানে পরীক্ষা নয়, শেখা হবে কেন্দ্রবিন্দু; প্রতিযোগিতা নয়, সক্ষমতা হবে মূল্যায়নের মানদণ্ড; মুখস্থবিদ্যা নয়, সৃজনশীলতা হবে অগ্রাধিকার; এবং শিক্ষার্থীকে কেবল পরীক্ষার্থী নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার্থীদের ওপর। আর শিক্ষার্থীদের আস্থা হারানো মানে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া। তাই সময়ের দাবি- শিক্ষাকে পরীক্ষার সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে মুক্ত করে মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। তবেই রাজপথে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীর বদলে শ্রেণিকক্ষে স্বপ্নময় শিক্ষার্থীদের দেখা যাবে; আর সেটিই হবে বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের প্রকৃত সাফল্য।

লেখক : শিক্ষার্থী, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়