reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১ ঘণ্টা আগে

তিন সরকারের মেয়াদে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সাহাবুদ্দিন

ছবি : সংগৃহীত

তিন বছর তিন মাসের মেয়াদে আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত বিএনপি সরকার—এই তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করে ইতিহাস গড়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। তবে রাষ্ট্রপতি মনোনীত হওয়া থেকে শুরু করে পদত্যাগ করা পর্যন্ত তাঁর পুরো মেয়াদের প্রতিটি ধাপেই লেগে ছিল নানা রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনা-সমালোচনা।

নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক উত্তাল সময়ে পদে টিকে থাকা এবং পরবর্তীতে বিদায় নেওয়ার প্রেক্ষাপটটি দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

অবস্থান বদল ও প্রেক্ষাপট: ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে যখন মো. সাহাবুদ্দিনকে সরানোর দাবি প্রবল হয়ে ওঠে, তখন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার অযুহাতে মূলত বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তিনি পদে বহাল থাকেন।

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও তিনি পদে বহাল থাকেন এবং নতুন সরকারের সাথে তাঁর সুসম্পর্কের চিত্রই ফুটে ওঠে। নির্বাচন-পরবর্তী এক সাক্ষাৎকারে তিনি কঠিন সময়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রশংসা করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ও তাঁর সম্পর্কের সুতায় টান পড়ে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত। বঙ্গভবন সূত্র থেকেও ইঙ্গিত আসে যে, বিএনপির নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকেই মূলত তাঁর কাছে পদত্যাগের বার্তা পৌঁছানো হয়, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর বিদায়কে নিশ্চিত করে।

মনোনয়ন ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক: ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনের নিয়োগের সময় থেকেই বিতর্কের সূচনা। দলীয় ব্যাকগ্রাউন্ড পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তিনি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের জেলা পর্যায়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন ও বাকশালে সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো গণমাধ্যমে উঠে আসে।

একটি সাংবিধানিক ও নিরপেক্ষ পদে আসীন হওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য কতটুকু প্রভাব ফেলবে—তা নিয়ে নিয়োগের প্রথম দিন থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।

আইনগত জটিলতা ও দুদকের আইনি বাধা: মনোনয়নের পরপরই তাঁর নিয়োগের বৈধতা নিয়ে আইনি বিতর্ক তৈরি হয়। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন। দুদকের আইন অনুযায়ী, কোনো কমিশনার অবসর গ্রহণের পর সরকারের কোনো ‘লাভজনক পদে’ নিয়োগের যোগ্য হবেন না।

রাষ্ট্রপতি পদটি ‘লাভজনক’ কি না—তা নিয়ে রিট আবেদন পর্যন্ত গড়ায়। তবে পূর্বে ১৯৯৬ সালে সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার সময় হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের (যেখানে বলা হয়েছিল রাষ্ট্রপতি পদটি লাভজনক নয়) ভিত্তিতে এই চ্যালেঞ্জ খারিজ হয়ে যায়।

পদত্যাগপত্র ও বক্তব্যের বৈপরীত্য: রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর মেয়াদের অন্যতম বড় ঝড় আসে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র ইস্যুকে কেন্দ্র করে। ২০২৪ সালের আগস্টে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে তিনি শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র পাওয়ার কথা বললেও, পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন তাঁর কাছে এর কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই।

এই মন্তব্য দেশে চরম অসন্তোষের জন্ম দেয়। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সংগঠন তাঁর পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু করে। বিতর্ক চরমে পৌঁছালে বঙ্গভবন থেকে বিবৃতি দিয়ে বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে তিক্ততা: অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে রাষ্ট্রপতির সম্পর্কের টানাপড়েন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়ে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রধান উপদেষ্টার সাথে দীর্ঘদিনের সাক্ষাৎ না হওয়া, বিদেশের দূতাবাসগুলো থেকে তাঁর ছবি সরানো এবং প্রেস উইং গুটিয়ে নেওয়ার পেছনে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সেখানে নিজেকে ‘অপমানিত’ দাবি করে মেয়াদের মাঝপথেই সরে দাঁড়ানোর কথা ব্যক্ত করেছিলেন।

তবে শেষ পর্যন্ত নতুন নির্বাচিত সরকারের পথ ধরেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু বঙ্গভবন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইতি টানলেন মো. সাহাবুদ্দিন।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়