মার্কিন বাজারে অতিরিক্ত শুল্কের খড়্গ: কতটা চাপে পড়বে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত?

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য রোধে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের ওপর নতুন করে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) ঘোষিত এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক যুক্ত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যে আগে থেকেই গড় ১৫ শতাংশ শুল্ক বিদ্যমান ছিল। নতুন ১০ শতাংশ যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশি পণ্যে মোট শুল্ক দাঁড়াচ্ছে ২৫ শতাংশ। তবে প্রশ্ন উঠেছে, একক বৃহত্তম এই রপ্তানি বাজারে নতুন এই শুল্ক বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও অন্য বাণিজ্যে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলবে?
তাত্ক্ষণিক প্রভাব: শুল্ক বাড়লেও পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়প্রথম দৃষ্টিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক বড় ধাক্কা মনে হলেও, খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে শুল্কের পরিমাণে বড় কোনো হঠাৎ রদবদল হচ্ছে না।
আইনি ধারাবাহিকতা: গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন আদালতে পূর্বের 'পাল্টা শুল্ক' স্থগিত হওয়ার পর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের 'সেকশন ৩০১'-এর আওতায় ১৫০ দিনের জন্য ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। সেই মেয়াদের ধারাবাহিকতাতেই নতুন এই ১০ শতাংশ শুল্ক পুনর্বহাল করা হলো।
ছাড়ের সময়সীমা: যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রাপথে থাকা পণ্যগুলোকে আগামী মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাত ১২টা ১ মিনিট পর্যন্ত নতুন শুল্ক কাঠামোর আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
ব্যতিক্রম পণ্য: তেল, গ্যাস, সার এবং বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যকে এই অতিরিক্ত শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর সাপেক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান: মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর ওপরও ইউএসটিআর সমান বা অধিক শুল্ক আরোপ করেছে। ফলে বাজারে বাংলাদেশ একা পিছিয়ে পড়ছে না। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির একক বড় বাজার। সদ্য বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এই বাজারে ৯০৪ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা কি না তার আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি। ওই অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৮৬৯ কোটি ডলারের পণ্য। তার মানে, পাল্টা শুল্ক আরোপ হওয়ার পরও বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে।
প্রতিযোগীদের কার কত শুল্ক: যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ৮৫ শতাংশ তৈরি পোশাক। এই বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ হচ্ছে ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, কম্বোডিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান ও হন্ডুরাস।
ইউএসটিআরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৭টি দেশের পণ্য আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, আর্জেন্টিনা, যুক্তরাজ্য, কম্বোডিয়া, কানাডা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে মোট শুল্ক ১০ অথবা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হবে। তার বাইরে চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ব্রাজিল, মিসরসহ ৩৮টি দেশের পণ্যে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মূল প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপর বাড়তি শুল্কহার একই থাকছে, সেহেতু রপ্তানিতে নতুন করে প্রভাব পড়ার কোনো কারণ দেখছি না। তবে গত বছর পাল্টা শুল্ক কার্যকরের পর বাজারটিতে চাহিদা কিছুটা কমে যায়। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, শুল্কের এই খড়্গ উঠে গেলে পণ্যের চাহিদা বাড়বে। তবে সেটি শিগগিরই হচ্ছে না’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর না করার অভিযোগে এই শুল্ক আরোপ অন্যায় ও অযৌক্তিক। ইউএসটিআরের তদন্ত শুরুর পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত শুনানিতে কী হয়েছে, সেটি আমাদের জানানো হয়নি।’
ইউএসটিআর গত ১২ মার্চ পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশ যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে দেশগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তার আগে উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূলত তৈরি পোশাক ও সিমেন্ট খাতের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটি তদন্ত হচ্ছে। ইতিমধ্যে শুনানিও শেষ। শিগগিরই এই তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে ইউএসটিআর।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘শেষ বিচারে প্রতিযোগীদের তুলনায় আমাদের শুল্ক যদি বেশি হয়, তাহলে আমরা মুশকিলে পড়ব, না হলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো পাল্টা শুল্ক স্থগিত হলেও তার সমপরিমাণ শুল্ক হিসাব করেই তৈরি পোশাকের দর–কষাকষি করছে। কারণ, তাদের ধারণা ছিল, অন্য কোনো উপায়ে সেই পরিমাণ শুল্ক আরোপ হতে পারে।’









































