শিমলা পাল

  ১৪ ঘণ্টা আগে

মুক্তমত

বর্ষার জলাবদ্ধতা ও পলিথিন প্লাস্টিকের দাপট

আষাঢ়-শ্রাবণের অবিরাম মেঘের খেলা কাব্যগ্রন্থে রূপময় হলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আধুনিক শহরের ইট-কাঠের বাস্তবতায় তা রূপ নেয় বিষাদময় এক অধ্যায়ে। আকাশ মেঘলা হলেই শহুরে বাসিন্দাদের মনে আনন্দের চেয়ে দুশ্চিন্তার মেঘ ঘনীভূত হয় এখন। মুষলধারে বৃষ্টি শেষে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ কোথায়? উল্টো সামান্য কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই দেশের ছোট-বড় নগরগুলোর রাস্তাঘাট তলিয়ে যাচ্ছে কাদা-পানিতে। রিকশাচালক, স্কুলফেরত ছোট শিশুটির ভেজা বই খাতা কিংবা সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে না পারা চাকরিজীবীর উৎকণ্ঠা সবকিছুই ঢাকা পড়ে যায় নর্দমার উপচে পড়া কাদা-পানিতে।

এই দুর্ভোগের একটি বড় অংশ আমরা নিজেদের অসচেতনতায় নিজেরাই তৈরি করছি। আর সেই আত্মঘাতী অনুশীলনের নাম হলো আমাদের অনিয়ন্ত্রিত ‘পলিথিন ও প্লাস্টিক সংস্কৃতি’। আধুনিক মেগাসিটির পিচঢালা পথগুলো কেন জলকাদার নদী হয়ে যায়? উত্তরটা আমরা সবাই জানি, কিন্তু মানতে চাই না। এক বোতল পানি খেয়ে প্লাস্টিকের বোতলটা নর্দমায় ছুড়ে ফেলার পর আমাদের মনে যে সামান্যতম অপরাধবোধ তৈরি হয় না সেটাই এই শহরের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। যার কেবল রাজধানী ঢাকায় দৈনিক ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয় এবং মাত্র ৩৭.২ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য (রিসাইকেল) হয়। চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, উৎপাদিত এই প্লাস্টিকের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই একবার ব্যবহারযোগ্য বা ‘সিঙ্গেল ইউস’ প্লাস্টিক। আর সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে এই প্লাস্টিকের প্রায় ৪০ শতাংশই কোনো প্রকার প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া সরাসরি জমা হচ্ছে আমাদের অলিরগলির ড্রেন, বক্স কালভার্ট ও নালা-নর্দমায়।

বিজ্ঞান বলে, একটি পলিথিন ব্যাগ বা প্লাস্টিক বোতল মাটিতে পচে বিলীন হতে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বছর সময় নেয়। আমরা যখন কাঁচাবাজারের প্লাস্টিক ব্যাগ বা চা-কফির ওয়ান-টাইম কাপটি ব্যবহার শেষে নালা-নর্দমায় ছুড়ে ফেলি, তখন সেটি ভূগর্ভস্থ ড্রেনের তলদেশে জমে এক শক্ত প্রতিরোধ প্রাচীর গড়ে তোলে। চট্টগ্রাম ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের ড্রেন বা শাখা খালগুলো পরিষ্কার অভিযানে নামলে নর্দমার মুখ থেকে হাজার হাজার টন পলিথিনের আস্তরণ উদ্ধার হওয়ার দৃশ্য এখন নিয়মিত চিত্র। আমরা যখন পথ চলতে চলতে অবলীলায় একটি ওয়ান-টাইম প্লাস্টিকের বোতল বা পলিথিনের থলে ড্রেনের মুখে ফেলে দিই, তখন হয়তো ভাবি না। ফলে মুষলধারে নামা বৃষ্টির পানি নিচে নামার কোনো পথ না পেয়ে রাজপথে উপচে পড়ে, শহরজুড়ে জন্ম দেয় কৃত্রিম সাগরের।

এই জলাবদ্ধতা কেবল যাতায়াতের সাময়িক বিড়ম্বনার গল্প নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম ও অর্থনীতির বড় খেসারত। জমা পানির নিচে ঢেকে যাওয়া ড্রেনের খোলা মুখ কিংবা ম্যানহোল পথচারীদের জন্য হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী ফাঁদ। টানা নোংরা পানি জমায় কোটি কোটি টাকায় তৈরি সড়ক ক্ষয়ে গিয়ে খানাখন্দে ভরে যাচ্ছে। এর থেকেও বড় আতঙ্ক হলো, এই থমকে থাকা পানির প্রতিটি প্লাস্টিকের পাত্র এখন হয়ে উঠছে এডিস মশার নিশ্চিন্ত বংশবৃদ্ধির কেন্দ্র। বর্ষার শুরুতেই হাসপাতালের বারান্দায় ডেঙ্গু রোগীদের যে আহাজারি শুরু হয়, নর্দমায় জমে থাকা আমাদেরই ফেলা প্লাস্টিক কি তার জন্য কিছুটা হলেও দায়ী নয়?

এই জটিল ঘূর্ণাবর্ত থেকে বের হতে হলে শুধু রাজপথে সরকারি বর্জ্য অপসারণের গাড়ি নামালেই চলবে না। সমস্যার মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দরকার গৃহস্থালি পর্যায় থেকে সচেতনতার প্রতিফলন। কাঁচাবাজারে পলিথিনের বদলে পাটের ব্যাগ কিংবা কাপড়ের থলে ব্যবহারের অভ্যাস আমাদের সত্তায় ফেরাতে হবে। একইসঙ্গে ওয়ান-টাইম প্লাস্টিকের অপ্রয়োজনীয় আসক্তি দূর করা এবং শহরের অলিতে-গলিতে থাকা ড্রেনগুলোকে ময়লার ডাস্টবিন মনে করার মানসিকতা থেকে আমাদের অবসান ঘটাতে হবে।

মনে রাখতে হবে, ভূগর্ভস্থ নালা-নর্দমাকে প্লাস্টিকমুক্ত রাখতে না পারলে শত কোটি টাকার আধুনিক শহর উন্নয়ন প্রকল্প শেষ পর্যন্ত জলে ভেসে যাবে। প্রতিটি নাগরিক যদি প্রতিদিন একটি করে পলিথিন যত্রতত্র ফেলা বন্ধ করি, তবেই ড্রেনগুলো নিশ্বাস ফেলার সুযোগ পাবে, ফিরে পাবে পানির নিজস্ব গতিপথ। প্রতি বর্ষায় জলকাদায় ভিজে ক্ষোভ প্রকাশ করা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি কেবল অভিযোগের আঙুল তুলেই দিন পার করব, নাকি সমস্যার সমাধানে নিজেদের হাত দুটো বাড়িয়ে দেব? ড্রেনে জমে থাকা নোংরা পানি তখনই নামতে শুরু করবে, যখন আমাদের মানসিকতার জট খুলবে। পলিথিন ও প্লাস্টিকনির্ভরতা দূর করে আমাদের দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয় দিতে হবে। শহর বদলাতে হলে আগে বদলাতে হবে আমাদের নিজেদের। নিজের আঙিনা থেকে প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জনের মাধ্যমে আমাদের প্রিয় শহরকে এক স্বস্তিদায়ক, বাসযোগ্য ও জলাবদ্ধতামুক্ত এক নতুন সকাল উপহার দেওয়া সম্ভব।

আমরা আজ যে প্লাস্টিক বা পলিথিনটি অবহেলায় নর্দমায় ছুড়ে ফেলছি, তা হয়তো আজকের বর্ষায় আমাদের যাতায়াত থমকে দিচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি আমাদের সন্তান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক পঙ্গু এবং বসবাসের অযোগ্য শহর রেখে যাচ্ছে। কাদা-পানিতে থমকে যাওয়া এই নগরীকে বদলে দিতে খুব বড় কোনো বিপ্লবের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন কেবল বর্জ্যটুকু নির্ধারিত স্থানে রাখার সদিচ্ছা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি বাসযোগ্য, সবুজ ও স্বস্তিদায়ক শহর রেখে যাওয়ার দায়ভার কিন্তু আজ আমাদেরই।

লেখক : তরুণ লেখক ও কলাম লেখক, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়