রফিকুল ইসলাম, রাজবাড়ী
ডাকঘরের ‘সার্ভার’ ফাঁদে কোটি টাকা জালিয়াতি, দিশেহারা ৬০ পরিবার

রাজবাড়ী শহরের রেলগেট এলাকার চা দোকানি প্রণব সাহা। ভবিষ্যতের কথা ভেবে রক্তপানি করা অর্জিত এক লাখ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। সঞ্চয়পত্র কেনার উদ্দেশ্যে গত ৬ মে টাকা জমা দিতে যান রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে। কিন্তু সেখানে গিয়ে মুখোমুখি হন এক অভিনব প্রতারণার। ডাকঘরের লেটার রাইটার শিহাব মৃধা তাকে জানান—‘সার্ভারে সমস্যা থাকায় মেসেজ তাৎক্ষণিকভাবে যাবে না, পরে দেওয়া হবে।’ হাতে একটি জমা রসিদ ধরিয়ে দিয়ে তাকে বিদায় করা হয়। আড়াই মাস ধরে ধাপে ধাপে খোঁজ নিলেও একই অজুহাত শোনানো হয় তাকে। শেষমেশ জানা যায়, ওই লেটার রাইটার পুরো টাকা হাতিয়ে নিয়ে হাওয়া হয়ে গেছেন। আর ডাকঘরের খাতায় কখনো ওঠেনি প্রণব সাহার জমা টাকা।
শুধু প্রণব সাহাই নন, একই প্রক্রিয়ায় প্রতারণার শিকার হয়েছেন অন্তত ৬০ জন গ্রাহক। কারো এক লাখ, কারো দুই লাখ, আবার কারো তিন লাখ টাকা আত্মসাৎ করে এখন উধাও অভিযুক্ত শিহাব মৃধা। সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা ভুক্তভোগীদের কান্না আর উদ্বেগে এখন ভারী রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের প্রাঙ্গণ।
প্রতারণার কবলে সাধারণ মানুষের সারাজীবনের সঞ্চয়: সোমবার দুপুরে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে গিয়ে দেখা যায় প্রতারণার শিকার অসংখ্য মানুষের ভিড়। চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটানো মানুষের মুখে একই আকুতি—‘আমাদের জমানো টাকা কি ফেরত পাব?’
বরাট ইউনিয়নের উড়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা খোকন শেখ স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ডাকঘরের বারান্দায়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “দুই লাখ টাকা স্ত্রীর নামে সঞ্চয়পত্র করতে এনেছিলাম। কাউন্টার থেকে শিহাবের কাছে পাঠানো হয়। এখন শুনছি টাকা নাকি জমাই হয়নি।”
লক্ষণদিয়া গ্রামের বৃদ্ধ সনৎ বিশ্বাস ও নতুনবাজারের বাসিন্দা নাসরিন আক্তারসহ একাধিক ভুক্তভোগী তাঁদের জমানো টাকা হারিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নাসরিন আক্তার প্রশ্ন তোলেন, “অফিসের ভেতরের কারো প্রত্যক্ষ সমর্থন ছাড়া একজন সাধারণ লেটার রাইটারের পক্ষে এত বড় জালিয়াতি ঘটানো কীভাবে সম্ভব?”
যেভাবে প্রকাশ্যে এলো ঘটনা: ডাকঘর সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ জুলাই নতুন পোস্টমাস্টার হিসেবে শামীম আহমেদ যোগ দেওয়ার পর জালিয়াতির ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। যোগদানের প্রথম দিনই এক গ্রাহক শিহাব মৃধার হাতে লেখা একটি জমাস্লিপ নিয়ে এলে কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। এরপর একের পর এক অভিযোগ জমা হতে থাকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গত ১৩ জুলাই থেকে লাপাত্তা হয়ে যান শিহাব মৃধা। বন্ধ পাওয়া যায় তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনটি।
প্রশাসনের বক্তব্য ও তদন্ত কমিটির তৎপরতা: ঘটনার জেরে খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে চার সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির সদস্য ও কুষ্টিয়া ডাকঘরের পরিদর্শক (প্রশাসন) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, “লেটার রাইটারের কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকের টাকা গ্রহণ করার এখতিয়ার নেই। যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা দায় এড়াতে পারেন না। আমাদের তথ্যমতে, প্রায় ৬০ জন গ্রাহকের কোটি টাকার কাছাকাছি অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে। টাকা উদ্ধারে চেষ্টা চলছে।”
রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ জানান, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। থানার পরামর্শ অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি অভিযুক্তের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং তাঁরা টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলছেন।”
অন্যদিকে, তৎকালীন দায়িত্বে থাকা সাবেক পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র নিজের গাফিলতির কথা অস্বীকার করে জানান, গ্রাহকদের সবসময় কাউন্টারে বা ট্রেজারারের কাছে টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হতো এবং তাঁর অজান্তেই ঘটনাটি ঘটেছে।
অভিযুক্তের বাড়িতে স্বজনদের বক্তব্য: অভিযুক্ত শিহাব মৃধার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাঁর স্ত্রীকে নীরব থাকতে দেখা যায়। তবে ছোট ভাই মাহবুব মৃধা দাবি করেন, “ভাই এক সপ্তাহ আগে অফিসে যাওয়ার কথা বলে বের হয়ে আর ফেরেননি। টাকা-পয়সার বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। তবে অফিস থেকে ডেকে নিয়ে আমাদের সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।”
জমানো টাকা উদ্ধারসহ এই জালিয়াতি চক্রের পেছনে থাকা সকল সহযোগীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন প্রতারিত গ্রাহক ও স্থানীয়রা।
পিডিএস/এমএইউ









































