আব্দুর রউফ চৌধুরী

  ১২ ঘণ্টা আগে

উপন্যাস : পর্ব ১৮

অনিকেতন

বাহুবেষ্টনে ব্যর্থ হলেও সুন্দরী তখনো তার দৃষ্টির নাগালের বাইরে যেতে পারেনি। সুন্দরীর নেইলপালিশ-পরা পাদপদ্মবিধৌত জলপান করার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করবে কোন্ শক্তিনাশিনী, ভাবল পাকিস্তানের ভাগ্যবিধাতা।’

সভাপতি হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে খুঁটিয়ে খুুঁটিয়ে সময় দেখতে লাগলেন, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সংক্ষেপে সমাপ্ত করুন আপনার আলাপন।’

‘জি, আচ্ছা।’ মাসুদ মিয়া ডানহাতের আঙুলগুলো আলগা করে বলে যেতে লাগলেন, ‘সুন্দরীর পদযুগলও সরে যাচ্ছিল পাকিস্তানের ভাগ্যবিধাতার দৃষ্টি থেকে। এই উপলব্ধি করে পাক-প্রেসিডেন্ট মত্তহাতির শক্তি সংগ্রহ করে আঘাত বসাল নিজ শরীরে। চাবুকপিষ্ট গাধা যেমন ঘোড়ার মতো দুলকি দুলে ওঠে, ঠিক তেমনই দুলে উঠল সেরা পাঠানের দেহটিও। এরই মধ্যে আলগা হয়ে গেছে রমণীর কটিবসন। বেপরোয়া, বেসামাল, হিম্মতবান, সদর-এ-পাকিস্তান ও লৌহমানব তীব্রবেগে এগিয়ে এলো। অবশেষে তার প্রসারিত হাতে ধরা পড়ল ব্রিটিশ দেশরক্ষামন্ত্রী প্রোফিমোর গোপনপ্রিয়া, সভ্যসমাজে নিন্দিতা, দেবলোকচ্যুত ও দানবপূজ্য খ্রিস্টিন কিলার। তারপরই সে সুন্দরীর নগ্ন ঊরু ও প্রশস্ত বুক সাদরে ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। ঠিক সেই শুভমুহূর্তের এক অপূর্ব চিত্তাকর্ষক ফটো পরের দিন ভোরের পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার শোভাবর্ধন করল। সেদিন সব পাকিস্তানির মাথা লজ্জাবনত হয়েছিল কি, না গর্বে বুক ফুলে উঠেছিল, তা আপনাদের বিস্মরণ হওয়ার কথা নয়!’

মাসুদ মিয়া মুচকি হাসতে লাগলেন, আর তাজিদউল্লা নিশ্চুপ বসে রইল। সে তার চোখের কোণ দিয়ে তীক্ষèদৃষ্টি বাঁকা করে মাসুদ মিয়াকে দেখে নিল। সে এইরকম ঘটনা কোনো দিন জানতে চায়নি, তাই তার মন খুব ব্যথিত। ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে সে। হিন্দুবিধবা নারীর মতো দুঃখী-দুঃখীভাব তার মুখে ফুটে উঠল। আর বদরুদ্দিন, আরেকটি সিগারেট জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। একের-পর-এক ধোঁয়া এসে জমা হতে লাগল কাজির মুখের ওপর, দু-চোখ ছাড়া সবকিছুই ঢেকে গেছে ধোঁয়ায়, তাই চোখের উৎসুক দৃষ্টি ছুড়ে দিলেন বদরুদ্দিনের চিন্তাভাবনার তরঙ্গের দিকে, দেখে নিলেন বদরুদ্দিনের ভেতরের কিছু খবর, পরক্ষণে বললেন, ‘আজকের মতো এই বিষয়ের ইতিটানা উচিত। আর তর্কে অবতারণ না-করে আমাদের প্রধান অতিথি দস্তাবেজে দ্বীনের তথ্যপূর্ণ বক্তব্যে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।’

এই অবাঞ্ছিত কাহিনি শোনা থেকে রেহাই পেয়ে সফিকুল ইসলামরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন, নিঃশব্দেই হাসলেন। যথোপযুক্ত গাম্ভীর্যবদন বিস্তৃত করে, বক্তব্যের গুরুত্ব বাড়ানোর প্রয়াসে, দস্তাবেজে দ্বীন নিজের বয়স বাড়িয়ে দিলেন, অজান্তেই; তবে বয়স নিয়ে তিনি সদাসন্ত্রস্ত, কমিয়ে বলতে ওস্তাদ। সকলের প্রতি একে-একে দৃষ্টিবিনিময় করে, পরিবেশ তীক্ষèভাবে পর্যবেক্ষণ করে, অনুকূল বায়ুপ্রবাহ দৃষ্টে, পালতোলা নৌকার মাঝির মতো মৃদুহাসি উঁকি দিল তার চোখের কোণে। আস্তে আস্তে তার দৃষ্টির দৃঢ়তা শিথিল হল। স্বাভাবিকস্বরে পূর্বোক্ত কথার রেশ টেনে প্রকাশ করলেন, ‘দুনিয়া ও আখিরাতে পুঁজিলাভের নিশ্চয়তার জন্য সোজাপথ হচ্ছে মসজিদ নির্মাণ করা। ‘একঢিলে দুই পাখি বধ করা’- উপমাটি অবশ্য মানানসই হয়নি, বরং তার চেয়ে বলা চলে, ‘রথদেখা কলাবেচা’। না, না এও ঠিক হয়নি, উত্তম হয় যদি বলি, ‘দুটো নুরের অধিকারী হওয়া’- হজরত উসমানের মতো নবিদুহিতা দুজনকে শাদি করার বরকত পাওয়া।’ জলের গ্লাস হাতে তুলে নিয়ে মুখের কাছে এনে পাশে-বসা হাজি সোনা মিয়ার দিকে তাকিয়ে যোগ করলেন, ‘জলে ভিজে গলা আর আল্লাহর কালামে নিভে অন্তরজ্বালা, কী বলেন!’

হাজি সোনা মিয়া কৃতার্থ হয়ে অতিশয় জোরে বলে উঠলেন, ‘জি, জি, নিশ্চয়।’

ইত্যবসরে দস্তাবেজে দ্বীনের নজরে পড়ল তাজিদউল্লার ট্যারাচোখ, হাসি ফুটে উঠল তারও চোখের ভুরুতে। তিনি আবার একদফা চোখ বুলিয়ে নিয়ে শুরু করলেন, ‘ভেবে দেখুন, কী উপকার হবে দুজাহানে- একদিকে মসজিদের মাধ্যমে ইসলামিক শিক্ষা পেলে আপনার ছেলেমেয়েরা খ্রিষ্টসমাজের লাগামছেঁড়া বেয়াড়া ঘোড়ার মতো উচ্ছৃঙ্খল জৈবতাড়নায় দৌড়ানো থেকে বিরত থাকবে। এটি কি কম সান্ত্বনা! আর অন্যদিকে, আপনি এবাদত বন্দেগির দ্বারা পরকালের পথ পরিষ্কার করবেন। পরকালের সুচিন্তাই তো মনের প্রশান্তি বৃদ্ধি করে।’

‘যে পরকাল ও পরের ঘরের গোপন সংবাদ আহরণ করে, সে নিজের মনের শান্তি হরণ করে।’ হঠাৎ বোমা ফাটলে মানুষ যেমন হকচকিয়ে যায়, তেমনই মাসুদ মিয়ার আচমকা কথায় সভাস্থ সকলের অবস্থা হয়ে উঠল।

‘আপনাকে কি ভূতে পেয়েছে?’ গর্জে উঠলেন বদরুদ্দিন। সকলের বাক্যবাণে বেচারা মাসুদ মিয়ার ম্রিয়মাণ অবস্থা। কোলাহল থামানোর জন্যই কাজি বললেন, ‘মাগরিবের নামাজের সময় সমুপস্থিত। একটিমাত্র সিঙ্ক, ফলে একজন একজন করে অজু করতে হবে, সময় লাগবে প্রচুর, তাই আপাতত আলোচনা স্থগিত রাখাই উচিত।’

বাদ নামাজ, আলোচনা আর তেমন জমে উঠল না। বাইরের মেঘাচ্ছন্ন ক্লান্তিভরা আকাশ উবু হয়ে ঘরে ঢুকে আঁধার করে দিচ্ছে সকলের মন-মানসিকতাকে, উবে গেছে সব উৎসাহ। তাই একে-একে বিদায় নিলেন সদস্যরা, আগামী সভায় পুনর্মিলনের প্রতিশ্রুতি দিলেন অনেকেই, শুধু পেছনে রয়ে গেলেন দস্তাবেজে দ্বীন, হাজি সোনা মিয়া ও সৈয়দ সঞ্জব আলি। একফাঁকে, কাজির কানে বদরুদ্দিন বললেন, ‘খানাপিনার ব্যবস্থা রয়েছে, প্রধান অতিথির সম্মানে।’

মা-সহ দুই মেয়ে সারাসন্ধ্যাব্যাপী অনেকরকম রান্না করে- পোলাও, কোর্মা, রোস্ট, ইলিশ ভাজা- খাবারটেবিল সাজিয়েছে। পায়েসে আঙুল ডুবিয়ে লাভলী শেষবারের মতো মিষ্টির ভাগও পরীক্ষা করে নিয়েছে, তারপর মনে-মনে বলল : বিন্দুমাত্র কম পড়েনি।

সন্ধ্যার আকাশ, আশেপাশের গাছপালার গায়ে ভেজা সন্ধ্যার ছায়া, গাঢ় ধূসরবর্ণের আকাশের গা-ঘেঁষে ইলশাগুঁড়ি বৃষ্টি ঝরছে কয়েকদিন ধরে, থামছে-না একমুহূর্তের জন্যও। বিলাতি মনেও, কীভাবে কে জানে, মেঘলা আকাশ বিরক্তিকর একরকম উপলক্ষ্য তৈরি করে চলেছে। কাচের জানালায় ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করেছে। বাগানের গাছগুলো পাগলের মতো দুলছে। লাভলী রান্না শেষ করে খাবারটেবিল সাজাতে গিয়ে হঠাৎ বাইরের পৃথিবীকে দেখে নিল। আকাশে পাখির মতো উড়ে যাচ্ছে মেঘমালা, হঠাৎ বুঝতে পারল জীবনের দুর্দান্ত সময় তার সামনে এসে উপস্থিত। ঘন বৃষ্টির কুয়াশায় তার মন আচ্ছন্ন। ভাবনা, দুঃখ, মন-খারাপ, দুশ্চিন্তা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখস্বপ্ন- সবকিছুই ক্রমে ক্রমে তার মাথামগজে ভিড় জমাতে লাগল। বুকের মধ্যে গুরুগুরু শুরু হয়েছে, কিন্তু চেহারা তার শান্ত, গভীর আবার মধুময়, পরিপাটি বেশবাস, পাশের মানুষের চোখ কেড়ে নেওয়ার মতো। তখনই বদরুদ্দিন তার পেছনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ও মা। এখানে দাঁড়িয়ে কী দেখছ! খাবার রেডি করো। মেহমানরা যে অপেক্ষা করছেন। তাড়াতাড়ি করো মা।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়