আব্দুর রউফ চৌধুরী

  ৩ ঘণ্টা আগে

উপন্যাস : পর্ব ১৭

অনিকেতন

অসংলগ্নতার লক্ষ না-করেই কথাগুলো তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এলো। এটুকু বলে নিজেকে একটু হালকা মনে করলেন তিনি। প্রশংসা কুড়োতে ব্যস্ত হয়ে উঠল তার আঁখিদ্বয়।

‘আমরা অবশ্য উপভোগ করছি আপনাদের সারগর্ভ আলাপ, তবু আর অগ্রসর হতে দিতে পারি না; কারণ, আমাদের বিশিষ্ট অতিথি ইসলামিক-সেন্টার পরিকল্পনার রূপরেখা আপনাদের সামনে তুলে ধরবেন। এদিকে শীতের রাত ঘনিয়ে আসতে কতক্ষণ, তাই...’ সভাপতির বক্তব্য শেষ করার আগেই মাসুদ মিয়া বাধা দিয়ে বিনীতভাবে বললেন, ‘আমাকে এক মিনিট সময় দিতে হবে প্লিজ। প্রাক্তন পাক-প্রেসিডেন্ট ঘটিত একটি ঘটনার দুটো কথা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই শুধু।’

অবসন্নতার সময় মানুষ সিগারেট খায়, কাজি একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, তিনি সিগারেট খান না, তবে মন বলছে সিগারেট খেলেই ভালো হতো। কাজির মনের অনুরোধটি বুঝতে পারলেন সৈয়দ সঞ্জব আলি, তাই তিনি তামাকশুখা প্যাকেট থেকে বের করে বিড়ি তৈরি করতে-করতে বললেন, ‘তাহলে বলে ফেলুন অল্পকথায়। পরে অযথা কল্পনাজল্পনা করব কেন!’

মাসুদ মিয়ার চোখেমুখে আনন্দ প্রকাশ পেল। সৈয়দ সঞ্জব আলি সিগারেট ধরালেন, ধোঁয়া ছাড়লেন, মাসুদ মিয়া সেই উড়ন্ত ধোঁয়ার জটলার দিকে দৃষ্টি স্থাপন করে শুরু করলেন, ‘আমি ধরে নিতে পারি যে, ব্রিটিশ দেশরক্ষামন্ত্রী প্রোফিমোর গোপনপ্রিয়া আনন্দবালা খ্রিস্টিন কিলার ও পাক-প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের কাহিনি আপনাদের নিশ্চয়ই বিস্মৃত হয়নি। ১৯৬৩ সালের এক শুভদিনে, এই লন্ডনেই, ধনীর চিত্তবিনোদিনী ইংরেজ মডেল খ্রিস্টিন কিলারের সঙ্গে জলকেলিতে তথাকথিত ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, পাঠান ও লৌহমানব আইয়ুব খান একেবারে গলে মোম হয়ে গিয়েছিল। সুন্দরীর গায়ে লেপটে থাকার অনেক চেষ্টা করেও সে সাঁতারে অপটু হওয়ায় পিছিয়ে পড়ল। আর সুন্দরী জলকে দুভাগে বিভক্ত করে এগিয়ে চলল, তার কলাচতুর সাবলীল দেহলতার কিরণবিচ্ছুরণ আইয়ুব খানের মস্তিষ্কে বিকৃতি ঘটাল। সুন্দরীর অবশ্যই ছিল স্খলিতবসন, জলাবৃত কটিবসন। তবু তাকে বাহুবেষ্টনে বাঁধার ব্যর্থ চেষ্টায় গলদঘর্মে পর্যবসিত হল আইয়ুব খান। হায় রে, কী পরিতাপ!’ মাসুদ মিয়া একটু থেমে, ঢোক গিলে ঠোঁটের ওপর আলতোভাবে হাতচাপা দিলেন। তার দৃষ্টি ঘুরে বেড়াতে লাগল ঘরময়। তাজিদউল্লার ওপর যখন দৃষ্টি পড়ল তখন সে তার সজল নয়ন নত করল। তখনই তার দৃষ্টিনিবদ্ধ হল লায়নার ওপর আঁকা ছবির দিকে, খরগোশ দৌড়াচ্ছে একটি কুকুরকে। তাই হয়তো তাজিদউল্লা অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করল, ‘নাউজুবিল্লাহ।’ আর মনে-মনে বলতে লাগল : আজ কোন্ কুক্ষণে বেরিয়ে ছিলাম বাড়ি থেকে, আমার আদর্শ পুরুষের এটি কী নাজেহাল! হজরতের নির্দেশের কীরকম বরখেলাপ!

মাসুদ মিয়া এবার দৃষ্টিনিবদ্ধ করলেন সফিকুল ইসলামের ম্লানবদনের দিকে, তাকেই আরও বেদনাহত করার উদ্দেশে বললেন, ‘তারপর বাহুলতাস্পর্শ লালসাকাম শিখায় লেলিহান আইয়ুব খান ছুঁইছুঁই করেও ছুঁতে পারল না রমণীকে, বরং তার পরিশ্রান্ত দেহ আইঢাই করছিল; তবে ইসলামধর্মের নামে যে-পাঠান জানফানা করে দিতে প্রস্তুত, সে-ই পাঠান কি এত সহজে পরাজয় মেনে নিতে পারে? নর্তকীর তালে-বেতালে নৃত্যের ভঙ্গিতে সমতারক্ষায় সচেষ্ট নয় কি আইয়ুবী-দেহ? সে তো এককালে পাঠানের জাতীয় নৃত্য খট্টকে মেডেল পেয়েছিল, আর মডেলজ্ঞানে সমবয়সিরা সমীহ করে চলত তাকে, সবসময়। এই আদরে লালিত আইয়ুব খান সেদিন মহাপরীক্ষার সম্মুখীন হলো।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়