আব্দুর রউফ চৌধুরী

  ০৩ জুলাই, ২০২৬

উপন্যাস : পর্ব ১৬

অনিকেতন

মাঘ মাসের সকালে পরিণামাজ্ঞ শিশুর মুখে আইসক্রিম দিলে তার যে-অবস্থা হয়, ঠিক তেমনই কাজির দিকে মুখাবয়ব করে তাকালেন দস্তাবেজে দ্বীন। এইরকম দাতার বেদনাকাতর বদন নিরীক্ষণে সক্ষম হলে কাজি অবশ্যই, সঙ্গে-সঙ্গেই বন্ধ করে দিতেন মাসুদ মিয়ার ‘বকুয়াছ’, কিন্তু সেইসময় কাজির দৃষ্টি নিবদ্ধ জানালার পর্দার ফাঁকে একফালি বৃষ্টিভেজা আকাশের দিকে, যেখানে গাংচিল উড়ে-উড়ে একটি বিন্দুতে পরিণত হচ্ছে সেইখানে। মাসুদ মিয়ার সিসাগলা কথা নির্দ্বন্দ্ব-অনিচ্ছুক কানে প্রবেশ করতে লাগল, ‘শুধু গালভরা বুলি দিয়ে আজকাল কুলিকে দিয়েও কাজ করানো যায় না। এমতাবস্থায় ভুলে যাও ভৌগোলিক সীমারেখা; অ-ইসলামিক শিক্ষাপদ্ধতি ইত্যাদি ইত্যাদি বলা পাগলের প্রলাপই বটে; কারণ, জ্ঞানীর মনে ইসলামিক নীতিকথার ইতি ঘটেছে গত চৌদ্দশত বছরের অবাস্তব দৃষ্টান্তে।’

দস্তাবেজে দ্বীন আর ধৈর্য ধরে বসে থাকতে পারলেন না। একজন মুসলমানের কথায় চূড়ান্ত আঘাত পেলেন, জোর প্রকম্পনে আন্দোলিত হচ্ছে তার অন্তর, চোখেমুখে বিরক্তির সুস্পষ্ট চিহ্নও জেগে উঠেছে। তাই মাসুদ মিয়াকে বাধা দিয়ে তিনি বললেন, ‘ক্যাপিটালিজম ও কমিউনিজম- উভয়ই ব্যর্থ হয়েছে আর্থসামাজিক সমস্যা-সমাধানের ক্ষেত্রে, তাই নেমে এসেছে নৈতিক অধঃপতন। সমস্যা-সমাধান-সন্ধানে বিজ্ঞজন ও গবেষকবৃন্দ দ্বিগুণ জরুরি ভিত্তিতে এখন ইসলামধর্মের দিকে তাকিয়ে আছেন, গণমানুষের আর্থিক উন্নয়ন প্রচেষ্টায় বিশ্বব্যাপী বিফলতার ব্যথাজর্জরিত অন্তরে, একটি সুনির্দিষ্ট পথের অন্বেষণে, মেঘাচ্ছন্ন আঁধার রাত্রে অচেনা হাওড়ে পথহারা মাঝি ফিরে-ফিরে তাকাচ্ছে ধ্রুবতারার দিকে। আপনারা জানেন অ্যাংলো-অ্যামেরিকান বাজার-অর্থনীতি এবং রাশিয়ার সমাজ-অর্থনীতি- উভয় মতবাদ বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে এখন একেবারে বরবাদ হয়ে গেছে।’

উপস্থিত শ্রোতাবর্গ সম্মতিজ্ঞাপন করলেন সন্তুষ্টচিত্তে, আকার ও ইঙ্গিতে, কথায় ও ভঙ্গিতে। নিজ বুদ্ধির প্রশংসা দেখে উজ্জ্বলতর হল দস্তাবেজে দ্বীনের মুখমণ্ডল, যেন মাগরিবের সময়ের মুয়াজ্জিনের আহ্বানে একটি তারকার আবির্ভাব ঘটল। অবশ্যম্ভাবী পরাজয়ের শক্তহস্ত থেকে নিষ্কৃতির শেষ চেষ্টা করলেন মাসুদ মিয়া। দস্তাবেজে দ্বীনের কথার জের টেনে, আত্মপ্রত্যয় যথাসম্ভব বজায় রেখে, বন্ধ-জানালার বাইরে দৃষ্টিনিবদ্ধ করে, প্রায় স্বগতোচ্চারণ করলেন, ‘চাঁদনিরাত্রে তারাভরা আকাশের নিচে মানুষ ধ্রুবতারার কথা প্রায়ই ভুলে যায়। অবশ্য অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে ইসলামধর্মের যোগ্যতা আছে কি, না নেই, তা এখন পর্যন্ত পরখ করে দেখা হয়নি।’

‘কুরআনিক সত্য প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহ যে-সমাজ এবং যে-রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রণয়ন করেছেন, তা বাস্তবায়িত করলে সফলতার দায়িত্ব তিনিই স্বয়ং গ্রহণ করবেন, এর প্রতিশ্রুতি রয়েছে কুরআনে। এই সত্য শেষবয়সে মওলানা ভাসানী উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই তো তিনি ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে তৎপর হন।’ বললেন দস্তাবেজে দ্বীন।

মাসুদ মিয়া চমকে উঠলেন, ভাতের ফ্যান উথলে হাঁড়ির ঢাকনা যেমন ফরফরিয়ে ওঠে, ঠিক তেমনই দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, মুখ তার উষাম্লান চাঁদ। বললেন, ‘শ্রুতিমধুর হলে বক্তাকে বাক্পটু হয়তো-বা বলা যায়, তাই বলে বক্তব্য যে অন্তঃসারশূন্য নয়, এর নিশ্চয়তা কি দেওয়া যায়! সকলই জ্ঞাত আছেন নিশ্চয়, সৌদি আরব ও ইরান সম্বন্ধে। উভয়ই ইসলামিক রাষ্ট্র, কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক চলে। জনসাধারণের জীবনযাত্রা ইসলামিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করার দায়দায়িত্ব গ্রহণের দাবিদার উভয় সরকারই। এইসব নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই তো তারা একে-অন্যের ঘাড় ভেঙে তরতাজা রক্ত দিয়ে শরবত পান করার জন্য বাঘের মতো ব্যগ্র হয়ে উঠেছে, শুধু সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।’

‘হ্যাঁ, এই দুই দেশের চেয়ে পাকিস্তানের ইসলামিক বিধিব্যবস্থা অনেকগুণ উত্তম। বহুপূর্ব থেকে এই নিয়ম চলে আসছে কি না! এই ধরুন, ফিল্ডমার্শাল মহামান্য প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের কথা। কী আচ্ছা উচ্চলম্বা বড়ো জওয়ান ছিলেন। পাঠান কি না তাই ইসলামধর্মের প্রতি অত্যধিক টান ছিল তার। এই জাতি ও ধর্মের জন্য প্রাণ কুরবান করতে সদাপ্রস্তুত।’ সফিকুল ইসলাম এতক্ষণ সুযোগ খুঁজছিলেন নিজের উপস্থিতি জ্ঞাপনের জন্য, কিন্তু সুযোগ পাননি, তাই মাসুদ মিয়া বসামাত্রই, কেউ কিছু বলার আগেই, বলে ফেললেন এই কথাগুলো।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়