মিসর-আর্জেন্টিনা ম্যাচ নিয়ে বিতর্ক, প্রকৃত ঘটনা কী

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ১৬-এ ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত আর্জেন্টিনা বনাম মিসরের ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ও রোমাঞ্চকর ম্যাচ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তের দুর্দান্ত কামব্যাকে ৩-২ ব্যবধানে জয়ী হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায়। তবে ম্যাচ চলাকালীন এবং ম্যাচ শেষে রেফারিং ও বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ম্যাচটিতে তৈরি হওয়া মূল বিতর্কগুলো এবং সেগুলোর যৌক্তিকতা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. মিসরের গোল বাতিল: ম্যাচের ৬০তম মিনিটে মিসরের মোস্তফা জিকো একটি দারুণ কাউন্টার অ্যাটাক থেকে গোল করে দলকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু রেফারি ফ্রঁসোয়া ল্যতেক্সিয়ে ভিএআর (VAR) রিভিউ দেখে গোলটি বাতিল করেন। কারণ আক্রমণের বেশ কিছুটা আগে বিল্ড-আপ পর্বের শুরুতে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে ফাউল করা হয়েছিল। (অবশ্য জিকো এর কিছুক্ষণ পরেই আরেকটি বৈধ গোল করে ঠিকই ২-০ করেছিলেন)।
ফুটবলের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, গোল হওয়ার বিল্ড-আপে কোনো ফাউল থাকলে ভিএআর-এর মাধ্যমে গোল বাতিল করা বৈধ। তবে মিসরের কোচ হোসাম হাসান এবং ফুটবল বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ফাউলটি গোল করার অনেক আগে এবং মাঠের অন্য প্রান্তে হয়েছিল। এত পেছনে গিয়ে গোল বাতিল করার সিদ্ধান্তটি মিসরের জন্য বেশ কঠোর ও দুর্ভাগ্যজনক ছিল। সাবেক দাবা চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন।
২. শেষ মুহূর্তে মিসরের পেনাল্টি আবেদন নাকচ: ম্যাচের সবচেয়ে বড় এবং ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণী বিতর্কটি ঘটে ইনজুরি টাইমে আর্জেন্টিনার জয়সূচক ৩য় গোলের ঠিক আগে। মিসরের পেনাল্টি বক্সের ভেতর মোহামেদ সালাহ বা হামদি ফাতিকে ফাউল করা হয়েছিল বলে দাবি করে মিসরীয় দল। বিশেষ করে আলেক্সিস মাক অ্যালিস্টার কর্তৃক হামদি ফাতির জার্সি টেনে ধরার বিষয়টি রিপ্লেতে স্পষ্ট দেখা গেছে বলে তাদের দাবি ছিল। কিন্তু রেফারি খেলা চালিয়ে যান এবং ভিএআর-ও কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। এর ঠিক পরপরই কাউন্টার অ্যাটাকে এনসো ফের্নান্দেস আর্জেন্টিনার পক্ষে জয়সূচক গোলটি করেন।
প্রকৃতপক্ষে, মিসরীয় শিবিরের এই অভিযোগের যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। ম্যাচ শেষে মিসরের কোচ হোসাম হাসান সরাসরি ফিফা ও রেফারিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলেন, "তারা হয়তো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও মেসিকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছে।" রেফারি অন্ততপক্ষে ভিএআর চেক না করায় বিতর্কটি আরও ঘনীভূত হয়। এই ঘটনার পর মাঠের পাশেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং মিসরের গোলরক্ষক কোচ সাফান এল-সাঘিরকে লাল কার্ড দেখানো হয়।
৩. ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ভুয়া ছবি ও পক্ষপাতের দাবি: ম্যাচ চলাকালীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর কিছু ছবি ও মিম ভাইরাল হয়। ছবিতে দেখা যায়, আর্জেন্টিনা যখন ২-০ তে পিছিয়ে ছিল, তখন ইনফান্তিনো গ্যালারিতে বসে মাথায় হাত দিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন কিংবা নখ কামড়াচ্ছেন। এর ওপর ভিত্তি করে সমর্থকরা দাবি করতে থাকেন যে, ফিফা অফিশিয়ালরা আর্জেন্টিনার বিদায় নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং তারাই ম্যাচটি আর্জেন্টিনার পক্ষে প্রভাবিত করেছেন।
মূলত এই বিতর্কের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। পরবর্তীতে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমের ফ্যাক্ট-চেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো ওই দিন আটলান্টা স্টেডিয়ামে উপস্থিতই ছিলেন না। ভাইরাল হওয়া ছবিগুলো ছিল সম্পূর্ণ পুরোনো এবং ভুয়া, যা আর্জেন্টিনার প্রতি ফিফার পক্ষপাতের মিথ্যা গুঞ্জন তৈরি করতে ছড়ানো হয়েছিল।
প্রকৃতপক্ষে মিসর এই ম্যাচে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে অসাধারণ ও সুশৃঙ্খল ফুটবল খেলেছে। রেফারির কিছু সিদ্ধান্ত (যেমন পেনাল্টি না দেওয়া বা গোল বাতিল) অবশ্যই বিতর্কিত এবং ম্যাচের ফলে এর বড় প্রভাব ছিল। তবে এই রেফারিংয়ের পেছনে কোনো পূর্বপরিকল্পিত দুর্নীতি বা ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফুটবলের মাঠে রেফারি ও ভিএআর-এর কিছু সিদ্ধান্ত যেমন বিতর্ক তৈরি করে, এই ম্যাচটিও তেমনই একটি উদাহরণ।
পিডিএস/এমএইউ









































