ইমরান মাহফুজ

  ০৩ জুলাই, ২০২৬

বই আলোচনা

মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ

কবি আশিক রেজার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ক্লান্ত আগ্নেয়গিরি আবার ঘুমাও’ সমকালীন বাংলা কবিতায় এক দৃঢ় ও তাৎপর্যপূর্ণ উচ্চারণ। এই গ্রন্থে সময়, সমাজ, ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত বোধ এক জটিল অথচ প্রাণময় বিন্যাসে উপস্থাপিত হয়েছে। কবি এখানে কেবল ঘটনাপুঞ্জের বিবরণ দেন না; বরং সময়কে বিশ্লেষণ করেন, তার অন্তর্গত সংকটকে উন্মোচন করেন এবং ভাষার মধ্য দিয়ে সেই সংকটকে দ্রোহের এক কালোত্তীর্ণ অভিব্যক্তিতে রূপ দেন।

এই কাব্যগ্রন্থের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক মিথের সচেতন ও গভীর ব্যবহার। ‘আসহাবে কাহাফের জুলাই’ কবিতায় ধর্মীয় মিথকে সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে কবি এক বহুমাত্রিক সময় ও স্মৃতিবোধ নির্মাণ করেছেন। এখানে ‘জুলাই’ কোনো নির্দিষ্ট মাস নয়; এটি প্রতিরোধ, সংকট এবং অপেক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। একইভাবে ‘কৈবর্তের জুলাই’ কবিতায় প্রাচীন কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতি ফিরে আসে সমকালীন ব্যর্থতা ও বিপর্যয়ের আয়নায়। ইতিহাস এখানে নিছক স্মরণ নয়; বরং বর্তমানকে বোঝার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।

কবির গ্রাম বিষ্ণুপুর তার কাব্যভাষায় এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থিত। এই গ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি স্মৃতি, শেকড় ও অস্তিত্বের প্রতীক। গ্রামীণ জীবনের উপমা, লোকজ চিত্রকল্প এবং প্রকৃতির অনুষঙ্গের মাধ্যমে কবি এমন এক রূপকভাষা নির্মাণ করেছেন, যা শহুরে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীর সংলাপ তৈরি করে। এই সংলাপে গ্রাম যেন হারিয়ে যাওয়া নৈতিকতার প্রতীক, আর শহর হয়ে ওঠে বিচ্যুতি ও ভাঙনের চিত্র। ‘প্রান্তে পড়ে থাকি আলোহীন সাং নাম বিষ্ণুপুর।/কাঁটা কুড়ে খাই, অক্কা পেলে শুই ইন্নালিল্লাপুর।/মাফিয়া চেনে না, মাফিয়া যাপি না মাঠের ওপাড়।/তমসায় থাকি দূর-বহুদূর খবর আমার।’

জুলাইয়ের বিপুল আত্মত্যাগের পরও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জটিলতা কবিকে গভীরভাবে আহত করেছে। সেই বোধই বারবার উচ্চারিত হয়েছে তার কবিতায়। ‘৩৮ জুলাই বীরভূম’, ‘বেহাত বিপ্লব’, ‘কালচার মানে সংস্কার’, ‘দুঃশাসন দূর হ’, ‘প্রাণ মেলে না যে প্রাণে’, ‘সরকার মানে শত্রু শত্রু খেলা’, ‘মফিজ মরে গেছে’, ‘ফিলিস্তিন’ এবং ‘ইউক্রেন’- প্রতিটি কবিতাই সমকালীন রাষ্ট্র, রাজনীতি ও বৈশ্বিক সংকটকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এখানে কবি কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক নন; বরং তিনি এক সক্রিয় প্রত্যক্ষদর্শী, যিনি অন্যায়, ভণ্ডামি ও মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। রাষ্ট্র কিংবা নেতাকে সরাসরি ‘তুমি মিথ্যুক’ বলে সম্বোধন করা তার কাব্যিক সাহসেরই বহিঃপ্রকাশ।‘আস্তিনের সাপ আর কোমরের ছুরি/অযতনে রেখে যদি করো আহাজারি/লাভ নাই-/মাঝে-সাঝে ঘটবে ৩৬ জুলাই।’

এটি একটি শক্তিশালী কাব্যিক অভিব্যক্তি। তবে এই দ্রোহ একমাত্রিক নয়। এর মধ্যে যেমন ক্ষোভ আছে, তেমনি রয়েছে গভীর হতাশা ও ক্লান্তির অনুভব। ‘ক্লান্ত আগ্নেয়গিরি আবার ঘুমাও’- এই উচ্চারণে আমরা দেখি এক বিপ্লবী চেতনার অবসাদ, যেখানে দীর্ঘ সংগ্রামের পর কবি যেন সাময়িক বিশ্রামের আহ্বান জানাচ্ছেন। এই ক্লান্তি নিছক পরাজয়ের নয়; বরং এটি পুনর্গঠনের এক অন্তর্গত প্রস্তুতি। কবি যেন বুঝতে পারেন, প্রতিরোধের আগুন টিকিয়ে রাখতে হলে কখনো কখনো তাকে নিভে যাওয়ার ভানও করতে হয়। অবশ্য এই উচ্চারণকে ব্যঙ্গ বা স্যাটায়ারের আলোয়ও পাঠ করা যেতে পারে।

এই কাব্যগ্রন্থ পাঠ করতে করতে বাংলা কবিতার পূর্বসূরিদের স্মৃতি অনিবার্যভাবেই ফিরে আসে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়...’ যেমন সংগ্রামের আগুনকে জিইয়ে রাখে, তেমনি ফররুখ আহমদের ‘রাত পোহাবার কত দেরি, পাঞ্জেরি?’ আমাদের নিয়ে যায় অপেক্ষা ও প্রত্যাশার গভীরে। আবার আবুল হাসানের ‘রাজা যায়, রাজা আসে’ রাজনৈতিক চক্রের নির্মম বাস্তবতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। শামসুর রাহমানের ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে...’ কিংবা আল মাহমুদের ‘কি অশ্রু এ কি রক্ত’- এইসব কাব্যধারার সঙ্গে আশিক রেজার কবিতার এক অন্তর্লীন সংলাপ গড়ে ওঠে। তবে তিনি অনুকরণের মধ্যে আবদ্ধ নন; বরং এই ঐতিহ্যকে আত্মস্থ করে নিজস্ব কণ্ঠস্বর নির্মাণ করেছেন। ‘রক্ত দিয়া প্রজা তুমি, রহমানে রাজা/চালাক যত বানরকূলে দেশটা করে ভাগ।/বাসি রুটির গন্ধ শোঁকো, বিপ্লব বেহাত!/বিনা ভোটের খাদেম ভাজে ভুয়াতন্ত্র ভাজা।’

‘বিপ্লব বেহাত’ কবিতার মতো রচনাগুলো পাঠ করতে গিয়ে সমসাময়িক রেজাউদ্দিন স্টালিনের তদন্ত রিপোর্ট, কামরুজ্জামান কামুর আমাকে এবার পিছমোড়া করো, সাখাওয়াত টিপুর রাজার কঙ্কাল কিংবা হাসান রোবায়েতের এমন ঘনঘোর ফ্যাসিবাদে গ্রন্থে উচ্চারিত দ্রোহী সুরের কথা মনে পড়ে। তবে সেই ধারার আরও পরিণত, বহুমাত্রিক এবং অন্তর্মুখী এক প্রকাশ যেন আমরা পাই ক্লান্ত আগ্নেয়গিরি আবার ঘুমাও গ্রন্থে। আশিক রেজার কবিতায় এই দ্রোহ আরো মানবিক, আরো মাটির কাছাকাছি। এখানে কেবল প্রতিবাদ নয়; রয়েছে মানুষের প্রতি গভীর দরদ, শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সত্যের প্রতি এক অবিচল আস্থা। ‘দুঃশাসন দূর হ।/দূর্যোধনে আসতে দে।/রাজার বাচ্চা ভীমের ভক্ত-/কোমর ভেঙে পড়তে দে।’

ক্লান্ত আগ্নেয়গিরি আবার ঘুমাও সমকালীন বাংলা কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। আশিক রেজা তার কাব্যে যে মাটি-মানুষের বয়ান, ঐতিহাসিক সচেতনতা এবং সমকালীন দ্রোহকে একসূত্রে গেঁথেছেন, তা তাকে দীর্ঘদিন প্রাসঙ্গিক রাখবে বলেই মনে হয়। বইটি কেবল একটি কবিতার বই নয়; এটি সময়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত এক প্রতিবাদী দলিল, যা পাঠকের ভেতরেও নতুন করে প্রশ্ন, প্রতিরোধ এবং আত্মসমালোচনার বীজ বপন করে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়