কামরুজ্জামান

  ১২ ঘণ্টা আগে

মূল্যায়ন : রেজাউদ্দিন স্টালিন

বাংলা কবিতার স্বতন্ত্র শুদ্ধতম কণ্ঠস্বর

আবহমান বাংলা কবিতার ধারাক্রমে আশির দশকের কবিতা নানা বিষয় বৈচিত্র্য আঙ্গিক প্রকরণে বিশিষ্ট হয়ে আছে। কঠিন জীবন বাস্তবতা যুদ্ধবিধ্বস্ত বিবিধ সামাজিক নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে এই সময়ের কবি ও কবিতার বিস্তার। সত্তুরের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আর আশির যুদ্ধ-পরবর্তী পারিবারিক সামাজিক রাষ্ট্রীয় উত্থান-পতন আশির কবিতার মানস গঠনে ব্যাপক প্রভাব লক্ষযোগ্য।

কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের কাব্য অভিযাত্রা এই সময়ের মধ্য দিয়েই বিকশিত। তার সূচনালগ্নেই তিনি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেন। আমি তখন সবে বিভিন্ন দৈনিক সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের দপ্তরে আসা-যাওয়া শুরু করেছি মাত্র। দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক কবি আল মুজাহিদী ভাইয়ের টেবিল ঘিরে তরুণ কবি, কবি যশপ্রার্থীর ভির ছিল সকাল-বিকাল।

রেজাউদ্দিন স্টালিনের প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘ফিরিনি অবাধ্য আমি ‘আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। বইটির প্রকাশনা উৎসবে আমার অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য হয়েছিল তখন। কবিতার এই ধরনের অনুষ্ঠানে যোগদান ছিল আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। সভামঞ্চ আলো করে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে যারা উপস্থিত ছিলেন, লক্ষ্য করেছি সে দিন- তারা অকুণ্ঠ সমর্থন ভালোবাসা আর অকৃত্রিম সুবচনে সবাই কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের প্রথম কাব্য প্রয়াসকে সাধুবাদ জানিয়ে ছিলেন। সেই অসামান্য আয়োজনে উপস্থিত হয়ে আমার বিস্ময়ের শেষ ছিল না।

পরবর্তী সময়ে তার একান্ত সান্নিধ্যে লাভ করতে সমর্থ হই, তিনি স্নেহ ভালোবাসায় কাছে টেনে নিয়েছেন বাংলা কবিতার অন্তহীন কাব্য যাত্রায়। এরপর বহু কবিতা উৎসবে, কবিতা পাঠের আয়োজনে তার স্বকণ্ঠে ‘ফিরিনি অবাধ্য আমি’ গ্রন্থ থেকে নাম কবিতাটি আবৃত্তি শুনেছি, মুগ্ধ হয়েছি।

‘আমার যাবার আগে পথ যায়/পথ চলে যায়/আমি যাব পথের চেয়েও দূরে’।/(ফিরিনি অবাধ্য আমি)।

এখানে তিনি তার যাত্রাকে মহিমান্বিত করেছেন বোধের নিগূঢ়তম চেতনার বৈভব থেকে। কোনো ক্লান্তি, আড়ষ্টতা তাকে স্পর্শ করে না। তিনি যেতে চান পথের চেয়েও আরো দূরে, কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দুর কথা এখানে নির্দেশ করা হচ্ছে না। এই দূর যাত্রার বাসনা তাকে স্থির করেনি অদ্যবধি। তিনি তার সূচনালগ্নেই পরিষ্কার বুঝতে স্বক্ষম হয়েছিলেন যে, কবিতার অভিযাত্রা কোনো সামান্য পথ নয়। কবিতার পাশাপাশি এই যাত্রা জীবনের বন্ধুর পথকেও নির্দেশ করে। যখন তিনি অন্য কবিতায় উল্লেখ করেন-

‘আমার সময় গো-ক্ষুরের মতো বিভাজিত/মুহূর্তগুলো কালো কৃষকের পায়ের মতো ফাটা/আমার জন্ম কোনো সময়কে ইঙ্গিত করে না/এমনকি ঘটনাগুলো মুহূর্তের শৃঙ্খলমুক্ত...। (সূচনা পর্ব)

কবি তার সময়কে শনাক্ত করেন গো-ক্ষুরের মতো বিভাজিত রেখায়। আর উপমা হিসেবে উপস্থিত করেন কালো কৃষকের পায়ের মতো ফাটা। তখন আর আমাদের বুঝতে সামান্যতম অসুবিধা হয় না যে, এই দ্বিধাগ্রস্ত সময় তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এক কঠিন জীবন সংগ্রামের সম্মুখে, একই কবিতার শেষ পঙ্ক্তি- ‘আমার জন্মের আগে পৃথিবীতে কোনো লগ্ন ছিল না/আমার চিৎকারই পৃথিবীর প্রথম সূচনা।’ (ঐ)

এই সাহসী সত্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে কবি তার বর্ণাঢ্য সূচনা ঘোষণা করেন, এর মধ্যে একধরণের দৃঢ়তা আছে, অহম আছে। কবি মাত্রই কখনো না কখনো এই অপার স্বাধীনতা শৃঙ্খল মুক্তির বাসনায় আক্রান্ত হন।

বিগত শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপীয় কিছু কাব্য সমালোচক অভিমত ব্যাক্ত করেন, কবিতার আলোচনায় কবির জীবনকেও সংযুক্ত করতে হবে। কেননা একজন কবির কাব্য সম্ভার তুল্য-মূল্য আলোচনা, বিচার বিশ্লেষণ করতে গেলে তার জীবন জীবনাচরণকে ও আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তারা বলছেন, একজন কবি তার কবিতা রচনার প্রেরণা যাপিত জীবনের বহুমাত্রিক অনুষঙ্গ থেকে লাভ করেন, তাই তার জীবনকে আলোচনার বাইরে রেখে সঠিক কাব্য বিচার সম্ভব নয়।

আমরা যদি কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের প্রতিদিনের জীবনাচরণের দিকে আলোকপাত করি। তবে দেখব তার পোশাক পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে, রুচি বোধ পাঠের অভ্যাস, সকল কিছুর মধ্যেই এক স্বাতন্ত্র্য পরিলক্ষিত। যাপিত জীবনের এই পরিশীলিত নান্দনিকতায় তার কাব্য ভাষাভঙ্গি হয়ে উঠেছে একান্তই নিজস্ব। যা আর বাংলা ভাষাভাষি অন্য কোনো কবির সাথেই কোনো সাজুয্য রক্ষা করে না।

এখানে আমরা একটু পেছনের দিকে যেতে চাই, একটু নয় অনেকটা পেছনের দিকেই ফিরে দেখতে হবে আমাদের। কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন সেই মাটিরই সন্তান। আমরা যদি আঠারো শতকের দিকে যাই মাইকেল মধুসূদনের হাত ধরে যে আধুনিক বাংলা কবিতার উদ্ভব, সেখানে তার কবিতার পৌরুষ দীপ্ত বাচনভঙ্গি, পেলবতা গীতলতা থেকে দিয়েছিল অপার মুক্তি। যে শৃঙ্খল বাংলা কবিতাকে নমনীয় করে রেখেছিল কান্নার আর বিলাপের সুরের মধ্যে। কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনকে সেই পথ অনুসরণ করতে আমরা আগ্রহী হয়ে উঠতে দেখি না কখনো। তিনি স্বভাবসুলভভাবেই লাভ করেছেন পৌরুষ চিত বলিষ্ঠ ভাষাভঙ্গি। তার কোনো কবিতায়ই কোনো চরিত্রকে নতজানু হতে দেখা যায় না, নমনীয় আবেদন নিবেদনেও ভারাক্রান্ত নয় কেউ।

‘চোখের ভেতর মুখ দেখেছি/আয়না কি দরকার?/পৃথিবীতে স্বচ্ছতম আয়না পাওয়াই ভার,/পারদ তো নয় কাচের নিচে গভীর অন্ধকার।/চোখের ভেতর মুখ দেখেছি/আয়না কি দরকার?/পথের কাছে পথ পেয়েছি/ভয় কি হারাবার?/ (আয়না কি দরকার)

এই যে পরিষ্কার করে বলা, চোখের মধ্যে মানুষের সর্বঅঙ্গ দর্শন করার বিদ্যা তা তার বলার কৌশল কে আলাদা করেছে। কোনো দ্বিধা সংকোচ না রেখেই যখন তিনি বলেন পৃথিবীতে স্বচ্ছতম আয়না পাওয়াই ভার। শূন্যতা অপ্রাপ্তি সামাজিক অবক্ষয় যখন এই পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়ে পড়ে, তখন আমাদের এখানে কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। আবার যখন কবি এই শূন্যতা স্তব্ধতা থেকে তার পাঠককে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন এই বলে যে, পথের কাছে পথ পেয়েছি ভয় কি হারাবার? মানুষ তখন আশার আলো প্রত্যক্ষ করে জীবনের সৌন্দর্যকে বেঁচে থাকার আনন্দকে উপলব্ধি করে। একজন কবির কাছে দিশেহারা সাধারণ মানুষ পথের দিশা প্রত্যাশা করে।

কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন শুধু চমক সৃষ্টির অভিপ্রায়ে পঙ্ক্তি রচনা করেন না, সামান্য বিনোদনের জন্যও নয়। তিনি তার রচিত পঙ্ক্তিমালার মধ্য দিয়ে মানুষকে নিয়ে যেতে চান দূর লক্ষ্যে পৌঁছার দিক নির্দেশনায়-

‘একশো বছর পর ভিনসেন্ট ভ্যানগগ/আবার উঠে দাঁড়ালেন উজ্জ্বল এক শস্য ক্ষেতের কিনারে/তিনি হাঁটছেন দরিদ্র কৃষক/আর মজুদের বাড়ির পাশ দিয়ে/কে কেমন আছে খোঁজ খবর জানার চাই তার/বেলজিয়ামের কালো কয়লা খনির শ্রমিক/হল্যান্ডের আলুভাজি কৃষক প্রত্যেকের মুখ মনে পড়ছে তার।’ (থিও তখনো বাড়ি ফেরেনি)

কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন তার কাব্যযাত্রার প্রারম্ভেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্যানভাসে বিস্তৃত করেছেন তার চিন্তার বিস্তার। তিনি কোথাও গণ্ডি বদ্ধ হয়ে থাকেননি ছড়িয়ে পড়ছেন সারা বিশ্বময়। এখানে একটা বিষয় আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে যে, আমরা উন্নত বিশ্বের চাকচিক্য অবলোকন করে মুগ্ধ হই দিবারাত্রি। তিনি কিন্তু ‘থিও তখনো বাড়ি ফেরেনি’ কবিতায় সেসব কথা বলছেন না। এখানে আমরা দেখি- চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছে সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ের খেটে খাওয়া মানুষের কথা। তারা হলো দরিদ্র কৃষক মজুর কয়লা খনির শ্রমিক আলুভোজি সাধারণ মানুষ। এই কবিতার মূল চরিত্র কালজয়ী চিত্রশিল্পী ভ্যানগগ একশো বছর পর এসে জানতে চাচ্ছেন প্রতীকী তাৎপর্যে দরিদ্র কৃষক মজুর কয়লা খনির শ্রমিকরা কেমন আছে। তাদের জীবন মানের কী উন্নয়ন ঘটেছে, তাদের মৌলিক অধিকারগুলো আজ পূর্ণতা পেয়েছে কি না।

যখন একজন কবি এই ধরনের মানবিক জিজ্ঞাসার সামনে উপস্থিত করেন, তখন তার সৃষ্টি কর্মের প্রতি সম্মান সমীহ প্রদর্শন করা আমাদের কর্তব্য হয়ে ওঠে। রেজাউদ্দিন স্টালিন ইচ্ছে করলে এই কবিতায় ভ্যানগগকে অন্য সৌকর্যে আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে দাঁড় করিয়ে পাঠকের চোখে রঙিন স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, তিনি তো দরিদ্র কৃষক মজুর কয়লা খনির শ্রমিকের প্রতি সমব্যথী হয়ে উঠেছেন। এতে করে তার মানবিক মূল্যবোধর প্রতি আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ভালোবাসা জন্ম লাভ করে।

জাতীয় জীবনের যাবতীয় দুঃখ দুর্দশা তাকে আক্রান্ত করে প্রবল ব্যথা বেদনায়। দুর্বার সাহস আর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর নিয়ে তিনি প্রতিবাদ প্রতিরোধে গড়ে তোলেন তার সকল সামর্থ্যে দেশপ্রেম দিয়ে।

‘ফেলানী ফেলনা নয় ফেলানী মেঘের বোন নদীর হৃদয়/সারা বাংলাদেশ আজ ফেলানীর পিতৃ পরিচয়।’ (ফেলানী বৃত্তান্ত)

আমরা দেখেছি অবাক বিস্ময় নিয়ে, এই দেশে যারা উচ্ছিষ্ট ভোগী কবি, সাহিত্যসেবী নামধারী চর গুপ্তচর। তাদের কলম থেকে এক বিন্দু কালি খরচ হতে দেখিনি ফেলানীর সেই মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক মৃত্যুতে।

জাতির স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও যারা পাথরের মতো শীতল ও নীরব, তখন তাদের প্রতি ঘৃণা উৎপাদন ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে এগিয়ে এসেছেন এই বলে ‘সারা বাংলাদেশ আজ ফেলানীর পিতৃ পরিচয়’।

প্রেম অনাদিকাল থেকেই কবিতার প্রধান অনুষঙ্গের অন্যতম। নর-নারীর দেহগত সম্মিলন, প্রেমিক প্রেমিকার প্রতি যে দুর্বার আকর্ষণ, তা-ই উপজীব্য সূচনালগ্ন থেকে প্রেমের কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে। প্রেমের কবিতা রচনাও রেজাউদ্দিন স্টালিন প্রদর্শন করেছেন সংযম পরিশীলিত বাক্যবন্ধ।

‘একটা ছায়া দেহের সাথে একটা ছায়া একা/একটা ছায়া কায়ার কাছে অদৃশ্য অদেখা।/একটা দিন দীর্ঘ হোক সূর্য ডোবার আগে/একটা রাত রাত্রি হোক চাঁদের অগ্রভাগে।’ (একটা দিন)

মানুষ যখন প্রেমাসক্ত হয়ে ওঠে তখন সে তার কল্পনার জগতে দিন-রাত্রিকে সাজিয়ে তোলে নানা মূল্যবান অলঙ্কারে। সাধ্যের অতিরিক্ত চেয়ে জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে চায় প্রেমিকের জন্য। এখানে এই যে একটা ছায়া কায়ার কাছে অদৃশ্য অদেখা, এর অর্থ হলো এক আত্মার মধ্যে বিলীন হওয়ার বাসনা। যেন-বা একই বৃন্তে দুটি পুষ্পের অবস্থান।

একটা বিষয় প্রণিধানযোগ্য যে, কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন তার ব্যাপক বিস্তৃত কাব্য সম্ভারে কোথাও কোনো অপ্রয়োজনীয় পঙ্ক্তি অহেতুক কোনো শব্দ ব্যবহার করেননি। অবোধ্য কিংবা দুর্বোধ্যতায় আক্রান্ত হননি তিনি কোথাও। শিল্প প্রকাশের যে ফর্মা বা আত্মপ্রকাশের অবকাঠামো কথা আমরা জানি। রিয়ালেস্টিক, সেমি রিয়ালেস্টিক এবং এ্যাবস্ট্রাকট ফর্ম, রেজাউদ্দিন স্টালিন তার সমগ্র কাব্য প্রয়াসে সিংহভাগ থেকেছেন রিয়ালেস্টিক ফর্মে, কখনো কখনো সেমি রিয়ালেস্টিক ফর্মে, এ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্মে যাননি কখনো। অহেতুক জটিলতা দুর্বোধ্যতায় আক্রান্ত হননি কখনো। সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলা কবিতার সতন্ত্র শুদ্ধতম কণ্ঠস্বর কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়