নিজস্ব প্রতিবেদক
হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল থামছে না

দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও উপসর্গে প্রাণহানি ৮১০ জনে দাঁড়িয়েছে। হাম-সংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকাল শুক্রবারের এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টার মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৩৭ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে (পরীক্ষায় প্রমাণিত) ১৫ হাজার ১৯৪ জন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ১ লাখ ২২ হাজার ১৫০ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৭১৭ জন যাদের মধ্যে ১ লাখ এক হাজার ৫৬ জন হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। হাম প্রার্দুভাব মোকাবিলায় দেশে চলতি বছরের ৫ এপ্রিলে শুরু হওয়া শিশুদের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন ২০ মে শেষ হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ দাবি করছিল, টিকাদানের এক মাসের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। গত ৫ মাসে হামের থাবায় মৃত্যু হয়েছে ৭৭৯ শিশুর। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টিকার বাইরে থাকা শিশুরাই এখন আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এবং যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছে না তারা মারা যাচ্ছে।
সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় রুটিন টিকা কার্যক্রমে শিশুর ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় শিশুর ১৫ মাস বয়সে। চলতি বছরের মার্চের শুরুতে দেশব্যাপী হাম প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের হাম-রুবেলার টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু করে। সরকারি হিসাবে সাড়ে ৩ মাস আগে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শতভাগ টিকা দেওয়া হলেও আক্রান্ত ও মৃত্যু থামছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণ ও মৃত্যু প্রতিরোধে বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন চালানো হলেও যথাযথ মাইক্রোপ্ল্যানিং না হওয়ায় তেমন কাজে আসেনি ওই কর্মসূচি। ফলে হামে মৃত্যুর ছোবল থেকে এখনো শিশুদের রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হেলথে প্রকাশিত ‘বিয়ন্ড ইমিউনিটি গ্যাপস : হেলথ-সিস্টেম কনস্ট্রেইন্টস অ্যান্ড মিজলস মর্টালিটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু টিকার অভাবই নয়, দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর দুর্বলতাও হামে মৃত্যুর জন্য সমভাবে দায়ী। হামে প্রাণ হারানো ৩৪ জন শিশুর চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের ৭১ শতাংশেরই শেষ মুহূর্তে জীবন রক্ষাকারী আইসিইউ সুবিধা মেলেনি। যথাযথ চিকিৎসার খোঁজে ৮২ শতাংশ শিশুকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে আরো দেখা গেছে, আইসিইউ সংকট, জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসার অভাব, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে বারবার স্থানান্তর, রেফারেলে বিলম্ব, অক্সিজেন ও জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং চিকিৎসা ব্যয়- এসব কারণ হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ তথ্যমতে, মহাখালীর সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এখনো প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ১০ শিশু নিশ্চিত হাম ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। মহাখালীর সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (শিশু) ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বর্তমানে যারা ভর্তি হচ্ছে তাদের মধ্যে অধিকাংশই হামের টিকা থেকে বাদ পড়া শিশু। এদের মধ্যে কেউ টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার পরও টিকা পায়নি। আবার বিশেষ ক্যাম্পেইন চলছিল তখন অনেকের টিকা নেওয়ার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছায়নি। এছাড়া বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে টিকা নেওয়ার সুযোগ না পাওয়া শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির পরও সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ হলো লক্ষ্যভিত্তিক সব শিশুকে টিকার আওতায় না আনা। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের নিচে প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে সরকারের টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। তবে বাস্তবে ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে, যা সংক্রমণ অব্যাহত থাকার একটি বড় কারণ। তিনি আরো বলেন, শুধু টিকা দিলেই হবে না, টিকা কার্যকর হয়েছে কি না- তাও যাচাই করতে হবে। টিকা নেওয়ার পর শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি হয়েছে কি না, তা নমুনা পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা প্রয়োজন; যা এখনো করা হয়নি।
"









































