সিনথিয়া ইসলাম খুশবু
মুক্তমত
ব্যর্থতা মানে শুধুই পরিসমাপ্তি নাকি প্রশিক্ষণ?

মানুষের জীবনের সবচেয়ে ভুল বোঝা শব্দগুলোর একটি হলো ‘ব্যর্থতা’। শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে অপূর্ণ স্বপ্ন, হারিয়ে যাওয়া সুযোগ, হতাশা আর অসহায়তার ছবি। সমাজও যেন এই শব্দটিকে এমনভাবে ব্যবহার করে, যেন একবার ব্যর্থ হওয়া মানেই জীবনের সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্যর্থতা কোনো গন্তব্য নয়, কোনো শেষ অধ্যায় নয়; বরং এটি এমন একটি পথ, যা একজন মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা চিনতে, নিজেকে গড়ে তুলতে এবং আরো শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসতে শেখায়।
প্রত্যেক মানুষের জীবনেই এমন কিছু সময় আসে, যখন সব চেষ্টা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হয় না। আমরা সাধারণত আমাদের কল্পিত সময়ে, কল্পিত উপায়ে, কল্পিত সাফল্য না পেলেই নিজেকে ব্যর্থ বলে ঘোষণা করে দেই। অথচ জীবনের নিজস্ব একটি গতি আছে। প্রকৃতি কখনোই মানুষের স্বপ্নকে তার নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পূরণ করে না। বরং প্রতিটি স্বপ্নের জন্য আলাদা প্রস্তুতি, ধৈর্য এবং সময়ের প্রয়োজন হয়।
আজ আমরা যাদের সফল মানুষ হিসেবে দেখি, তাদের জীবনের গল্প পড়লে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সাফল্যের পেছনে ব্যর্থতার দীর্ঘ ইতিহাস লুকিয়ে থাকে। একজন বিজ্ঞানীর শত শত ব্যর্থ গবেষণা, একজন উদ্যোক্তার অসংখ্য লোকসান, একজন লেখকের প্রত্যাখ্যাত পাণ্ডুলিপি কিংবা একজন ক্রীড়াবিদের অসংখ্য পরাজয়; এসবই শেষ পর্যন্ত তাদের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করেছে। তাই ব্যর্থতা কখনোই সফলতার বিপরীত নয়; বরং সফলতারই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আসলে মানুষ ব্যর্থতাকে যতটা ভয় পায়, তার চেয়েও বেশি ভয় পায় ব্যর্থ হওয়ার পর সমাজের প্রতিক্রিয়াকে। আমাদের সমাজে সফল মানুষের জন্য করতালি আছে, কিন্তু সংগ্রামরত মানুষের জন্য খুব কম মানুষেরই ধৈর্য থাকে। ব্যর্থতার পর আত্মীয়-স্বজনের প্রশ্ন, বন্ধুদের বিদ্রুপ, পরিচিতদের তুলনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রদর্শিত সাফল্যের গল্প: সব মিলিয়ে একজন মানুষ নিজেকে অযোগ্য ভাবতে শুরু করে। অথচ যে মানুষটি গতকাল একই স্বপ্নের জন্য প্রশংসিত হচ্ছিল, আজ সে শুধু ফলাফল না পাওয়ার কারণে অবহেলার পাত্র হয়ে যায়।
এই সামাজিক চাপই অনেক সময় মানুষকে নিজের ওপর বিশ্বাস হারাতে বাধ্য করে। কেউ কেউ আবার হতাশাকে এতটাই আপন করে নেয় যে জীবনের প্রতিই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। অথচ একটি ব্যর্থতা কখনোই একজন মানুষের পুরো জীবনের পরিচয় হতে পারে না। একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, একটি চাকরি না পাওয়া, একটি ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া; এসবই জীবনের ঘটনা, কোনো মানুষের পরিচয় নয়।
আমাদের আরেকটি বড় ভুল হলো, আমরা অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্যের ছবি দেখে আমরা ধরে নিই, সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু আমরাই পিছিয়ে আছি। কিন্তু আমরা জানি না, সেই ছবির আড়ালে কত ব্যর্থতা, কত নির্ঘুম রাত, কত কান্না এবং কত সংগ্রাম লুকিয়ে আছে। পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের যাত্রাপথ আলাদা। তাই অন্যের গন্তব্যকে নিজের মানদণ্ড বানানো কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অনেক সময় আমরা এমন লক্ষ্যও নির্ধারণ করি, যা আমাদের নিজের নয়। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন কিংবা সমাজ যাকে সম্মানজনক মনে করে, তাকেই আমরা নিজের স্বপ্ন বলে ধরে নিই। কিন্তু নিজের আগ্রহ, দক্ষতা ও সামর্থ্যকে উপেক্ষা করে কেবল সামাজিক স্বীকৃতির জন্য কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করলে সেখানে সফল হওয়া কঠিন। কারণ মানুষ সবচেয়ে ভালো কাজটি করতে পারে তখনই, যখন সেই কাজের সঙ্গে তার মনের সংযোগ থাকে।
ব্যর্থতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি। আমরা প্রায়ই শুধু ফলাফল চাই, কিন্তু সেই ফলাফলের জন্য যতটা পরিশ্রম, অনুশীলন ও আত্মনিয়োগ দরকার, তা করতে প্রস্তুত থাকি না। একটি বীজ যেমন রাতারাতি মহীরুহ হয় না, তেমনি একজন মানুষও একদিনে সফল হয় না। প্রতিটি বড় অর্জনের পেছনে বছরের পর বছর প্রস্তুতি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টা থাকে।
জীবনের শুরুটা সবসময়ই এলোমেলো লাগে। নতুন কিছু শেখার প্রথম দিন, নতুন চাকরির প্রথম মাস, নতুন ব্যবসার প্রথম বছর কিংবা নতুন স্বপ্নের প্রথম পদক্ষেপ, সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা থাকে। ভুল হয়, ভয় কাজ করে, বারবার থেমে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু নিয়মিত চর্চা, ধৈর্য এবং অধ্যবসায়ই সেই অগোছালো পথকে ধীরে ধীরে সুন্দর ও সফল করে তোলে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা যতদিন চেষ্টা করছি, ততদিন আমরা ব্যর্থ নই। কারণ ব্যর্থতার প্রকৃত সংজ্ঞা চেষ্টা থেমে যাওয়ায়; ফলাফল না পাওয়ায় নয়। একজন মানুষ যখন নিজের স্বপ্নকে ছেড়ে দেয়, তখনই তার প্রকৃত পরাজয় ঘটে। কিন্তু যে মানুষটি শতবার পড়ে গিয়েও একশো একবার উঠে দাঁড়ায়, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাকেই বিজয়ী হিসেবে মনে রাখে।
শেষ পর্যন্ত সত্যটি খুবই সহজ, ব্যর্থতা মানে কোনো কিছুর পরিসমাপ্তি নয়, ব্যর্থতা মানে সফলতার জন্য প্রস্তুতির সময়। যে মানুষ যত দ্রুত নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে, যত দ্রুত নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে, সে তত দ্রুত সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তাই ব্যর্থতাকে ভয় নয়, সম্মান করতে শিখুন। কারণ ব্যর্থতা কখনো আমাদের শেষ করে না; ব্যর্থতা আমাদের প্রস্তুত করে।
লেখক : শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
"





































