ফারহানা মুনমুন
মুক্তমত
বন্যা নিয়ে এখনই ভাবার সময়

বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশের ছয়টি ঋতুর মধ্যে একটি বর্ষাকাল। বর্ষার রিমঝিম বৃষ্টি আর কদম ফুল যেমন প্রকৃতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে, তেমনি বর্ষা কখনো কখনো নদীমাতৃক বাংলাদেশে বন্যারও সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের বন্যা আমাদেরকে মারাত্মকভাবে ভাবাচ্ছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢল, অস্বাভাবিক বৃষ্টি, মানুষের পরিবেশ বিরোধী কার্যক্রম এবং জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। বন্যার কারণে হাজারো মানুষ শুধু ঘরবাড়ি হারাচ্ছে না, সেই সঙ্গে হারাচ্ছে জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
বন্যার পানিতে শুধু মাটি ডুবে যায় না, ডুবে যায় মানুষের বছরের পর বছর ধরে গড়া তোলা সংগ্রামী স্বপ্ন। যে কৃষক সোনালি ফসলের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি এক নিমিষে হয়ে পড়েন নিঃস্ব। যে শিক্ষার্থী বই খাতা নিয়ে নতুন দিনের অপেক্ষায় ছিল সে আশ্রয় কেন্দ্রে বসে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকে। হকার, ক্ষুদ্র বিক্রেতা ও দিনমজুরেরা তাদের সর্বস্ব হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। এমনকি অনেক গবাদি পশু ও বন্যপ্রাণী এই দুর্যোগে প্রাণ হারায় কিংবা ভেসে যায়। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ বন্যায় তাদের সর্বস্ব হারিয়ে জীবিকার তাগিদে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। বন্যার ক্ষতি শুধু তাৎক্ষণিক দুর্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। তাছাড়াও বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয় ফলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হয়। একটি দুর্যোগ ঠিক কতটা নির্মম হতে পারে তার বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে বন্যাকবলিত মানুষের চোখের ভাষায়। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো প্রতিবছর একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলেও আমরা এখনো পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারিনি। দুর্যোগের সময় শুধু ত্রাণ বিতরণ করে জাতিকে নিরাপদ রাখা যায় না। বন্যা প্রতিরোধে প্রয়োজন পরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন। কিন্তু দেশের বিভিন্ন জায়গায় অপরিকল্পিত উন্নয়ন আমাদের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রকৃতিকে আপন নিয়মে চলতে দেওয়া সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে আবহাওয়ার স্বাভাবিক গতি বদলে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে অতিবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে। এসব কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। অথচ এই সংকট সৃষ্টিতে আমাদের অবদান তুলনামূলকভাবে কম। শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশ দূষণ জলবায়ু পরিবর্তনে অনেকাংশে দায়ী অথচ এর ফল ভোগ করছে বাংলাদেশ সহ উন্নয়নশীল দেশগুলো। তাই আন্তর্জাতিকভাবে সহযোগিতার পাশাপাশি আমাদের নিজেদেরকেও প্রস্তুত হতে হবে। তবে দুর্যোগের এই ভয়াবহতার মধ্যে একটি ভালো দিক রয়েছে। বন্যার সময় আমাদের দেশে নানা প্রান্তের মানুষ যেভাবে দূর্গতদের পাশে দাঁড়ায় তা বাংলাদেশের মানুষের মানবিক শক্তির অন্যান্য উদাহরণ।
স্বেচ্ছাসেবক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, এমনকি সাধারণ মানুষও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানবতা সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমাদের মনে রাখতে হবে বন্যা পরবর্তী সময়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা ছাড়া দুর্যোগ মোকাবিলা কখনো পূর্ণতা পায় না। শুধু ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করলে আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না বরং প্রয়োজন সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার দীর্ঘ মেয়াদী উদ্যোগ। বন্যা একদিন ঠিক হয়ে যাবে, নদী তার স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে, কিন্তু যে শিশু বই হারিয়েছে, যে কৃষক ফসল হারিয়েছে, যে পরিবার তাদের একমাত্র আশ্রয় হারিয়েছে, যেসব পশু-পাখি বন্যার পানিতে ভেসে গেছে সেসব ক্ষতির চিহ্ন বহুদিন রয়ে যাবে। তাই আমাদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ সচেতনতা এবং দূরদর্শী পরিকল্পনাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত নয়, সহাবস্থানই হতে পারে আমাদের টিকে থাকার একমাত্র পথ। কারণ একটি জাতির প্রকৃত শক্তি শুধু তার উন্নয়নের পরিসংখ্যান নয় বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ বিপর্যয় রোধে তার দূরদর্শী উদ্যোগের মধ্যে নিহিত থাকে।
বন্যা আমাদের বারবার শিক্ষা দিয়ে যায় প্রকৃতিকে সম্মান করলেই প্রকৃতি আমাদের রক্ষা করবে। আমাদের প্রত্যাশা বন্যা যেন প্রতি বছরের নিয়তি হয়ে না দাঁড়ায়। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি যেখানে দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি নেওয়া হবে, ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পরিবেশবিদ, আবহাওয়াবিদ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই হতে পারে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা কার্যকরী হাতিয়ার। প্রকৃতিকে অবহেলা নয় বরং তার সঙ্গে সহাবস্থান হোক আমাদের উন্নয়নের মূল আদর্শ। আমাদের আজকের নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্তই আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, টেকসই ও দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারে। প্রকৃতিকে রক্ষা করা অর্থই আমাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
munmunfarhana2@gmail
"






































