ড. শহীদুল ইসলাম

  ১৬ ঘণ্টা আগে

মতামত

ভবিষ্যতের খাদ্য আগামীর স্বাস্থ্য

খাদ্য মানুষের জীবনের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে খাদ্যকে আমরা আর শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ হিসেবে দেখি না। খাদ্য এখন স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি বিষয়। পৃথিবীর জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, খাদ্য উৎপাদনের জন্য চাষযোগ্য জমি কমে যাচ্ছে, একই সঙ্গে বাড়ছেডায়াবেটিস, স্থূলতা, হৃদ্রোগ, ক্যানসারসহ নানা অসংক্রামক রোগ। এই বাস্তবতায় খাদ্যবিজ্ঞানও বদলে যাচ্ছে। একসময় এই শাখার প্রধান লক্ষ্য ছিল নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য সংরক্ষণ এবং খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা। এখন সেই সীমা বহুদূর অতিক্রম করেছে। আধুনিক খাদ্যবিজ্ঞান এমন খাদ্য তৈরি করতে চায়, যা মানুষের শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করবে, রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করবে, পরিবেশের ওপর কম চাপ সৃষ্টি করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

গত এক দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি, তথ্যবিজ্ঞান, জিনোম গবেষণা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে খাদ্যবিজ্ঞান এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং খাদ্যশিল্প এখন এমন সব প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনার বিষয় ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন নতুন খাদ্যপণ্য উদ্ভাবনে সহায়তা করছে, রোবট খাদ্য উৎপাদন লাইনে কাজ করছে, সেন্সর প্রযুক্তি খাদ্যের মান পর্যবেক্ষণ করছে, আর তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী খাদ্য নির্বাচন করা সম্ভব হচ্ছে। খাদ্যবিজ্ঞান আজ আর শুধু রান্নাঘর বা কারখানার বিষয় নয়; এটি এখন চিকিৎসাবিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান এবং পরিবেশবিজ্ঞানের সমন্বিত একটি আধুনিক জ্ঞানক্ষেত্র।

বর্তমানে খাদ্যবিজ্ঞানের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ব্যক্তিভিত্তিকপুষ্টি বা পার্সোনালাইজডনিউট্রিশন। বহু বছর ধরে আমরা বিশ্বাস করে এসেছি যে একটি নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, একই খাবার একেক মানুষের শরীরে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। একজন সুস্থ তরুণ, একজন ডায়াবেটিস রোগী এবং একজন বয়স্ক মানুষের শরীর একই পরিমাণ ভাত, রুটি বা ফলের প্রতি একইভাবে সাড়া দেয় না। কারো রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যায়, কারো ক্ষেত্রে খুব সামান্য পরিবর্তন হয়। কারো শরীর নির্দিষ্ট ধরনের চর্বি সহজে হজম করতে পারে, আবার অন্য কারো ক্ষেত্রে সেই একই খাবার দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান এখন সবার জন্য একই খাদ্য পরামর্শ দেওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তির বয়স, লিঙ্গ, ওজন, রোগের ইতিহাস, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুমের ধরন, রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষার ফল এবং জীবনযাত্রা বিবেচনা করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক খাদ্যপরিকল্পনা তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হলো মানুষের অন্ত্রে বসবাসকারী অগণিত অণুজীবের ভূমিকা। একসময় মনে করা হতো, অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া শুধু খাদ্য হজমে সাহায্য করে। এখন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই অণুজীবগুলো মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, মানসিক স্বাস্থ্য, এমনকি ডায়াবেটিস ও হৃদ্?রোগের ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফলে বিশ্বজুড়ে গাট মাইক্রোবায়োম নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। দই, কেফির, কিমচি, আচার কিংবা অন্যান্য গাঁজনকৃত খাদ্যের সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন গবেষণা প্রকাশিত হচ্ছে। প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক এবং সিনবায়োটিক খাদ্যের বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

আধুনিক খাদ্যবিজ্ঞানে আরেকটি বহুল আলোচিত ধারণা হলো ‘খাদ্যই ওষুধ’। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিজ্ঞানীরা এখন ক্রমশ উপলব্ধি করছেন যে সঠিক খাদ্য নির্বাচন শুধু শরীরকে সুস্থ রাখে না, বরং অনেক দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উচ্চ আঁশযুক্ত খাদ্য, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ ফলমূল, ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য কিংবা প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ দুগ্ধজাত পণ্য এখন চিকিৎসা ও পুষ্টিবিজ্ঞানের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ডায়াবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্?রোগ এবং ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে বিশেষভাবে পরিকল্পিত খাদ্য নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবেষণা চলছে। চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় খাদ্যের ভূমিকা আগামী দিনে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার খাদ্যবিজ্ঞানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আগে একটি নতুন খাদ্যপণ্য তৈরি করতে গবেষকদের বছরের পর বছর সময় লাগত। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হাজার হাজার উপাদানের রাসায়নিক গঠন, পুষ্টিমান, স্বাদ, গন্ধ এবং ভোক্তার পছন্দ বিশ্লেষণ করে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সম্ভাব্য নতুন খাদ্যের নকশা তৈরি করতে পারে। খাদ্য উৎপাদনের সময় কোনো ত্রুটি হচ্ছে কি না, কোনো পণ্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না কিংবা কোন খাদ্য কতদিন নিরাপদ থাকবে- এসব বিষয়ও এখন উন্নত অ্যালগরিদমের মাধ্যমে নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে। এমনকি অনেক দেশে সুপারমার্কেটগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ক্রেতাদের কেনাকাটার ধরণ বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের চাহিদার পূর্বাভাস দিচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে খাদ্য উৎপাদনের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় বিকল্প প্রোটিনের গবেষণাও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে উদ্ভিদভিত্তিক মাংস, ছত্রাক থেকে তৈরি উচ্চমানের প্রোটিন, শৈবালভিত্তিক খাদ্য এবং কোষ থেকে উৎপাদিত মাংস নিয়ে কাজ চলছে। এসব প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো কম জমি, কম পানি এবং কম কার্বন নিঃসরণ ব্যবহার করে মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা। যদিও এসব প্রযুক্তির অনেকগুলো এখনো উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে, তবুও আগামী দশকে এগুলো বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। আধুনিক সেন্সর, বায়োসেন্সর, ব্লকচেইন এবং স্মার্ট ট্রেসেবিলিটি প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন খাদ্য কোথায় উৎপাদিত হয়েছে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং কোন পথে ভোক্তার কাছে পৌঁছেছে- এসব তথ্য মুহূর্তেই জানা সম্ভব হচ্ছে। এতে খাদ্যে ভেজাল, দূষণ বা জীবাণুর উপস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং প্রয়োজনে বাজার থেকে নির্দিষ্ট পণ্য দ্রুত প্রত্যাহার করা সম্ভব হয়। আন্তর্জাতিক খাদ্যবাণিজ্যে এই ধরনের প্রযুক্তি এখন ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠছে।

খাদ্য মানুষের জীবনের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে খাদ্যকে আমরা আর শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ হিসেবে দেখি না। খাদ্য এখন স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি বিষয়। পৃথিবীর জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, খাদ্য উৎপাদনের জন্য চাষযোগ্য জমি কমে যাচ্ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হৃদ্রোগ, ক্যানসারসহ নানা অসংক্রামক রোগ। এই বাস্তবতায় খাদ্যবিজ্ঞানও বদলে যাচ্ছে। একসময় এই শাখার প্রধান লক্ষ্য ছিল নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য সংরক্ষণ এবং খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা। এখন সেই সীমা বহুদূর অতিক্রম করেছে। আধুনিক খাদ্যবিজ্ঞান এমন খাদ্য তৈরি করতে চায়, যা মানুষের শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করবে, রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করবে, পরিবেশের ওপর কম চাপ সৃষ্টি করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

গত এক দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি, তথ্যবিজ্ঞান, জিনোম গবেষণা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে খাদ্যবিজ্ঞান এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং খাদ্যশিল্প এখন এমন সব প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনার বিষয় ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন নতুন খাদ্যপণ্য উদ্ভাবনে সহায়তা করছে, রোবট খাদ্য উৎপাদন লাইনে কাজ করছে, সেন্সর প্রযুক্তি খাদ্যের মান পর্যবেক্ষণ করছে, আর তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী খাদ্য নির্বাচন করা সম্ভব হচ্ছে। খাদ্যবিজ্ঞান আজ আর শুধু রান্নাঘর বা কারখানার বিষয় নয়; এটি এখন চিকিৎসাবিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান এবং পরিবেশবিজ্ঞানের সমন্বিত একটি আধুনিক জ্ঞানক্ষেত্র।

বর্তমানে খাদ্যবিজ্ঞানের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ব্যক্তিভিত্তিক পুষ্টি বা পার্সোনালাইজড নিউট্রিশন। বহু বছর ধরে আমরা বিশ্বাস করে এসেছি যে একটি নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, একই খাবার একেক মানুষের শরীরে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। একজন সুস্থ তরুণ, একজন ডায়াবেটিস রোগী এবং একজন বয়স্ক মানুষের শরীর একই পরিমাণ ভাত, রুটি বা ফলের প্রতি একইভাবে সাড়া দেয় না। কারো রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যায়, কারো ক্ষেত্রে খুব সামান্য পরিবর্তন হয়। কারো শরীর নির্দিষ্ট ধরনের চর্বি সহজে হজম করতে পারে, আবার অন্য কারো ক্ষেত্রে সেই একই খাবার দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান এখন সবার জন্য একই খাদ্য পরামর্শ দেওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তির বয়স, লিঙ্গ, ওজন, রোগের ইতিহাস, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুমের ধরন, রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষার ফল এবং জীবনযাত্রা বিবেচনা করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক খাদ্যপরিকল্পনা তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

লেখক : খাদ্য বিজ্ঞানী, বার্মিংহাম, ইউকে

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়