আমানুর রহমান
দৃষ্টিপাত
বানের জলে ভাসমান শিক্ষাব্যবস্থা

একটি জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর অন্যতম প্রধান শর্ত হলো যুগোপযোগী ও সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের শিক্ষাঙ্গন আজ এক গভীর সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত। সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যা পরিস্থিতি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাজমান চরম অব্যবস্থাপনার চিত্রকে ভয়াবহভাবে তুলে ধরেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ দেশের নানা প্রান্ত যখন বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে, তখনো শিক্ষার্থীদের ওপর জোরপূর্বক বোর্ড পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়ার এক অমানবিক পাঁয়তারা চলছে। পানিবন্দি অবস্থায় শিক্ষার্থীরা যখন পড়াশোনার ন্যূনতম সুযোগটুকু পাচ্ছে না এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার মতো যাতায়াত ব্যবস্থাও নেই, তখন নীতিনির্ধারকেরা প্রাথমিকভাবে পরিস্থিতিকে গুরুত্ব না দিয়ে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনকে অবমূল্যায়নের চেষ্টা করেছেন। বন্যাদুর্গত রাস্তা পাড়ি দিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার অসম্ভব চ্যালেঞ্জের মুখে শিক্ষার্থীরা যখন পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানাচ্ছিল, তখন সেই দাবি শোনা তো হয়নি; উল্টো তাদের অবমাননা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন, তবু এই সান্ত্বনা জনমনের গভীর ক্ষত সারাতে যথেষ্ট নয়।
শিক্ষামন্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; এর ব্যত্যয় ঘটলে তার অবস্থান জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই সংকটকালে শিক্ষার্থীদের পাশে না দাঁড়িয়ে তাদের ওপর জোরপূর্বক পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত অমানবিকতারই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। ?শুধু পরীক্ষা আর সনদসর্বস্ব শিক্ষার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত নিজেদের সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধিকাংশ পরিকল্পনাই পরীক্ষাকেন্দ্রিক; অথচ একটি আকস্মিক সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্বে কী বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে, তা কখনোই বিবেচনায় নেওয়া হয় না। হুট করে পরীক্ষার তারিখ এগিয়ে আনা কিংবা খাতা অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে মূল্যায়ন করা হবে- এমন ভিত্তিহীন সংবাদ ছড়িয়ে প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। কোথাও মোমবাতি জ্বালিয়ে অন্ধকারে পরীক্ষা দিতে হয়, আবার কোথাও জরাজীর্ণ ভবনে মাথার ওপর থেকে সিলিং ফ্যান খসে পড়ে। এর মধ্যেই যুক্ত হয়েছে ভুল প্রশ্নপত্র সরবরাহের মতো অরাজক ঘটনা।
কোনো ইতিবাচক উদ্যোগকেও যদি মানসিক প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হতে বাধ্য। এর ফলে ভালো প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা খারাপ হয়ে যেতে পারে। যেকোনো নতুন সিদ্ধান্ত বা পরিবর্তন আনার আগে সেটি শিক্ষার্থীদের জন্য আদৌ কল্যাণকর কি না এবং কোনো আতঙ্ক তৈরি করবে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা নীতিনির্ধারকদের একান্ত দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থাকে বিন্দুমাত্র মূল্যায়ন না করে হঠকারী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার এই রীতি বন্ধ না হলে একটি সুস্থ ও মেধাবী প্রজন্ম গড়ে তোলার স্বপ্ন চিরকাল অধরাই থেকে যাবে। ?শিক্ষাক্রমের বিন্যাস ও মূল্যায়নের ধরনে থাকা বিশাল অসামঞ্জস্য শিক্ষার্থীদের ক্রমশ মুখস্থবিদ্যার দিকে ধাবিত করছে, যা তাদের প্রকৃত জ্ঞানার্জনের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। মাধ্যমিক (এসএসসি) ও উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) স্তরের সিলেবাসের পরিমাণের বিস্তর ব্যবধান আমাদের শিক্ষাক্রমের একটি প্রকট সমস্যা। এসএসসিতে অপেক্ষাকৃত সহজ পাঠ্যসূচি ও কম পড়ে আসা একজন শিক্ষার্থীকে এইচএসসিতে উঠে মাত্র দুই বছরের মধ্যে পদার্থবিজ্ঞানের প্রায় ২০টি অধ্যায়ের বিশাল বোঝা ঘাড়ে নিতে হয়, যা চরম অমানবিক। নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির এই চার বছরের শিক্ষাক্রমের মধ্যে একটি সুষম সমন্বয় সাধন করা তাই অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে, সৃজনশীল পদ্ধতির নামে আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে মূলত মুখস্থবিদ্যারই মহোৎসব চলছে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধা খাটিয়ে কোনো উত্তর লিখলে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকেরা নম্বর দিতে চান না, যদি না তা গাইড বইয়ের উত্তরের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। এর পাশাপাশি রয়েছে একশ্রেণির অসাধু শিক্ষকের অনৈতিক সিন্ডিকেট। তারা শিক্ষার্থীদের ব্ল্যাকমেইল করে নিজেদের কোচিংয়ে পড়তে বাধ্য করেন এবং পরীক্ষার আগে অর্থের বিনিময়ে বা ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে স্কুলের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দেন। নোটবই আর গাইডবইয়ের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য- অর্থাৎ চিন্তার বিকাশ- ঘটাতে না পারলে, এই শিক্ষাব্যবস্থা কেবল রোবটই তৈরি করবে; কোনো স্বাধীন ও চিন্তাশীল নাগরিক নয়। যেকোনো সফল শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকেন যোগ্য ও দায়বদ্ধ শিক্ষকমণ্ডলী। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষকদের জবাবদিহির চরম অভাব এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। উন্নত বিশ্বে কোর্স শেষে শিক্ষার্থীরা বেনামি মূল্যায়নের (অ্যানোনিমাস রিভিউ) মাধ্যমে শিক্ষকদের পড়ানোর মান যাচাই করে থাকে; যেখানে নেতিবাচক ফিডব্যাক পেলে একজন শিক্ষকের চাকরি পর্যন্ত চলে যাওয়ার নজির রয়েছে। অথচ আমাদের দেশে অনেক শিক্ষক গতানুগতিক স্লাইড বানিয়ে বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্য নিয়ে শ্রেণিকক্ষে এসে কেবল রিডিং পড়ে যান। শিক্ষার্থীরা ভয়ে টুঁ শব্দটিও করার সাহস পায় না, পাছে শিক্ষক ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের ব্যাচসমেত ফেল করিয়ে দেন!
?পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক ভাষাজ্ঞান এবং নৈতিকতার চর্চা একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষের বিকাশে অপরিহার্য হলেও আমাদের কারিকুলামে এই বিষয়গুলো চরমভাবে উপেক্ষিত। দীর্ঘ সময় ধরে ইংরেজি পড়ার পরও আমাদের শিক্ষার্থীরা একটি সাধারণ ইমেইল লিখতে বা সাবলীলভাবে বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলতে হোঁচট খায়। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল ‘টাস্ক বেজড ল্যাঙ্গুয়েজ টিচিং’ (টিবিএলটি) পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভিসা ফরম পূরণ বা হোটেল চেক-ইনের মতো বাস্তবমুখী কাজ দিয়ে ইংরেজি শেখাচ্ছে। ভারত এআই-চালিত ডিজিটাল ল্যাব ব্যবহার করে ইন্টারন্যাশনাল জব ইন্টারভিউয়ের মক সেশন করাচ্ছে। অপরদিকে, শিক্ষাঙ্গনে নৈতিকতার চর্চাও আজ তলানিতে ঠেকেছে। উন্নত দেশগুলোতে ‘অনার কোড’-এর মতো চমৎকার পদ্ধতি চালু আছে, যেখানে শিক্ষক কোনো গার্ড বা সিসিটিভি ছাড়াই শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন দিয়ে চলে যান এবং শিক্ষার্থীরা নিজ দায়িত্বে সততার সঙ্গে পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষা শেষে তাদের লিখিত উত্তরের পেছনের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হয়, যা শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা এবং নাগরিক বোধ (সিভিক সেন্স) বৃদ্ধি করে। শুধু বইয়ের পাতা মুখস্থ না করিয়ে শিক্ষার্থীদের যদি বাস্তবমুখী যোগাযোগ দক্ষতা ও মজবুত নৈতিকতার ভিত্তিতে গড়ে তোলা না হয়, তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এই দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা কখনোই কাটবে না। মেরুদণ্ডহীন ও তোষামোদকারী নেতৃত্বের পরিবর্তে একটি জবাবদিহিমূলক, যুগোপযোগী এবং শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারি।
লেখক : শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ
শান্তিনগর, ঢাকা।
"






































