শেখ সুলতানা মীম

  ২০ জুলাই, ২০২৬

মুক্তমত

সুপার এল নিনো জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন সংকট

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়; বরং এটি সারা বিশ্বের চরম বাস্তবতা। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে জলবায়ুর স্বাভাবিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে পরিবেশ প্রতিনিয়ত প্রতিকূল অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। যার প্রতিফলন হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, তাপপ্রবাহ, খরা, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা যাচ্ছে। জলবায়ুর এই চরম বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এল নিনো, যা বর্তমানে বিশ্বকে এক কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। সাধারণত এল নিনো হলো একটি জলবায়ুগত চক্র, যা দুই থেকে সাত বছর অন্তর ঘটে এবং বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ধরনকে প্রভাবিত করে। এটি সাধারণত বিষুবরেখা সংলগ্ন প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সংঘটিত হয়।

এল নিনো ঘটনাটি প্রথম শনাক্ত করেন ১৬০০-এর দশকে পেরুর জেলেরা। তারা এর নাম দিয়েছিলেন ‘এল নিনো দে নাভিদাদ’, যার অর্থ স্প্যানিশ ভাষায় ‘খ্রিস্ট শিশু’। সাধারণ এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা ১ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু যখন এই তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি বেড়ে যায়, তখন আবহাওয়াবিদ ও বিশেষজ্ঞরা একে ‘সুপার এল নিনো’ বলে অভিহিত করেন। বর্তমানে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব সুপার এল নিনোর প্রভাবের মুখোমুখি, যার ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। এর প্রভাবে আবহাওয়া চরম আকার ধারণ করে এবং বৃষ্টিপাতের ধরন ও সময় উলটপালট হয়ে যায়। ফলে তীব্র দাবদাহ, খরা, দাবানল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশ্বের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তোলে।

ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এল নিনোর প্রভাব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এল নিনোর প্রভাবে পূর্ব আফ্রিকায় অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। কেনিয়া, সোমালিয়া ও ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনাবৃষ্টির কারণে তীব্র খরা সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র খরা ও দাবানলের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু পশ্চিমা দেশগুলোই নয়, সুপার এল নিনোর প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের আবহাওয়াতেও এর প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। গ্রীষ্মকাল শেষ হওয়ার পরও দেশে তীব্র তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। আবার বর্ষাকালে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। ফলে মানুষের ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল এবং কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। উৎপাদিত ফসল পানির স্রোতে ভেসে গেছে। অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার কারণে পাহাড়ধসে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। বাংলাদেশে সুপার এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি ব্যবস্থা, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার মূল ভিত্তি। একদিকে অতিবৃষ্টির কারণে কোনো কোনো অঞ্চলে ফসল তলিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে কোথাও দেখা দিতে পারে তীব্র খরা ও অনাবৃষ্টি। এর ফলে নদ-নদী শুকিয়ে যাবে, মাঠঘাটে পানির অভাব দেখা দেবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরো নিচে নেমে যাবে। এতে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাবে এবং সারা দেশে সুপেয় পানির সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতি আরো তীব্র হবে। বর্তমানে বাজারে চলমান মূল্যবৃদ্ধিই সাধারণ মানুষের জীবনে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। এর সঙ্গে যদি খাদ্যসংকট যুক্ত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন আরো কঠিন হয়ে উঠবে। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের অর্থনীতির চাকা মন্থর হয়ে পড়বে। রপ্তানিমুখী কৃষিপণ্য ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের উৎপাদন কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ঘাটতি দেখা দেবে। একই সঙ্গে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে সুপার এল নিনোর প্রভাব শুধু পরিবেশ বা কৃষিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার জন্যও একটি বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কৃষির সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য আধুনিক সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে খরা ও উচ্চ তাপমাত্রা-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ফসলের আবাদ বৃদ্ধি করতে হবে।

জমিতে আর্দ্রতা ধরে রাখতে ড্রিপ ইরিগেশন বা ফোঁটা সেচ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সুপার এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ হলো বনভূমি সংরক্ষণ এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণ। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কমাতে বেশি করে গাছ লাগাতে হবে এবং বনাঞ্চল রক্ষা করতে হবে। এ জন্য সরকার ও দেশের সর্বস্তরের জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সবাইকে এল নিনোর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ একটি নিরাপদ, টেকসই ও সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ

sheikhsultanameem@gmail

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়