আবুবকর সিদ্দিক

  ২৮ মার্চ, ২০২৫

অগ্রন্থিত গল্প

মায়ের বুলি মধুর বুলি

সংগ্রহ ও ভূমিকা : মামুন মুস্তাফা

আবুবকর সিদ্দিক (১৯৩৪-২০২৩) কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও তার গল্প আমাদের কথাসাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ। তার অসংখ্য গল্প বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তেমনই একটি গল্প ‘মায়ের বুলি - মধুর বুলি’। গল্পটি প্রথম ‘লেখমালা’র প্রথম সংখ্যা জানুয়ারি-মার্চ ২০১৫-তে প্রকাশিত হয়। গল্পটিতে ’৪৭-এর দেশভাগের ফলে পরিবারের ছিন্ন হওয়া এবং তার সঙ্গে মাতৃভাষার যে যোগসূত্র, সেটি খুব আন্তরিকতার সঙ্গে তুলে ধরেন গল্পকার আবুবকর সিদ্দিক। একই সঙ্গে নিপীড়িত ভাগ্যহত নিরন্ন মানুষের যে সংগ্রাম, সেটিও জাজ্বল্যমান। তার অন্য গল্পের মতো এই গল্পও পঠনসুখ জুগিয়ে ফুরিয়ে যায়নি। এখানেই অনন্য কথাকার আবুবকর সিদ্দিক।

ভুটেমারির খালের উপর বাঁশের চার। চারের এপারে পোলডাঙা ওপারে ভুটেমারি। রিদয়মাস্টারকে যেতে হবে ভুটেমারি। জগা মণ্ডলের হাতে চিঠি পৌঁছে দিতে হবে। ইন্ডিয়ান স্ট্যাম্পের সীল মারা খামের ভিতর আটকানো। জরুরি চিঠি বটে। নিশ্চয় অশোকনগর থেকে মেয়েজামাই লিখেছে। শহরের ডাকপিয়ন বেতো রুগি হরিপদ ইশ্্কুলের হেডস্যারের হাতে খাম গুঁজে দায় সেরে কেটে পড়েছে। ভুটেমারিনিবাসী রিদয়মাস্টার অগত্যা তার দায়বাহী এখন। ওদিকে পুত্রকলত্রহীন জগা মণ্ডল হাঁপীকাশিতে বারোমাস বিছানাপোঁতা। কে নেবে দায়? ছিল শিবানী নামের কন্যাটি। পাশের গাঁয়ের রাখীমালের পাইকের বাসুদেব তাকে বিনা পণে বিয়ে করে নিয়ে সেই যে পশ্চিমবঙ্গের অশোকনগর চলে গেছে, আর হুদোহদিশ নেই।

চিঠিটা এখন প্রতিবেশী রিদয়মাস্টারের পকেটে। জগা খুড়োর বাড়ি মাড়িয়ে যেতে হবে তাকে। জায়গামত পঁহুছ করে দিতে বাধা নেই বটে। কিন্তু চার পেরিয়ে ভুটেমারির মাটিতে পা রাখতেই বুকে ধাক্কাটা লাগল। কড়ুইগাছের ডালপাতার আড়ালে লুকিয়ে সেই নাম-না-জানা পাখিটা ডেকে উঠল। যেন তাসানি পাঠাল রিদয়কে।

ঘামেধুলোয় জেরবার হয়ে মণ্ডলবাড়ির উঠোনে পা দিয়েই আরেকটা রামধাক্কা খেতে হল। বারান্দায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে কঁকাচ্ছিল জগা মণ্ডল। আর তার দিকে নজর সই করে একটা ভুঁড়েল শেয়াল হামা দিয়ে বসে ছিল খুঁটি জুড়ে। রিদয়কে দেখে সুবোধ প্রাণীটি নিঃশব্দে নেমে উঠোন পেরিয়ে জংগলের দিকে চলে গেল।

আতংকিত রিদয় প্রথমে গলাখাঁকারি দিয়ে পরে বেশ জোরে ডাক পাড়ল, খুড়ো চেতন আছোনি? ও র্সনো! র্সনোও-ও-! জগাবুড়ো উঁ-উঁ-করে মাথা থেকে চাদরটা সরাল কাঁপা হাতে। কাঁপা গলায় বলার চেষ্টা করল, কেডা? মাস্্টের নাকি? কী মনে করে? ও র্স্নো, একখান পিড়ে দিয়ে যা।

স্বর্ণ ঘুমুচ্ছিল ঘরে। চোখ ডলতে ডলতে উঠে এলো বাইরে।

- পেন্নাম হই, ছার ভালো আছেননি?

- এই চলে যাতিছে আর কী? তা খুড়ো, তোমার শরীলডায় কয় কী বর্তমানে?

- আর শরীল! শিবানীডা মা’রে থুয়ে গেইছে না আমারে? সেই যে বিছেনধরা হলাম আর-! তো মাস্টের, কওদিনি কী বাত্তা (বার্তা) আনিছো অব্যালায়?

গলা মোলায়েম করে নিবেদন করে রিদয়, তোমার নামে ইন্ডিয়াথ্থে একখান পত্তর ছেলো খুড়ো।

ধরা গলায় আর্তনাদ করে উঠলো জগাবুড়ো, চিঠি? আমার নামে? ও রিদয়! আমার শিবানী বাঁ’চে আছে তা’লি? মাস্্টের কতা কও।

স্বর্ণ যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে রিদয়ের উপর, দিদির

চিটি! কই? দেহি আমি।

জগা ক’ষে দাবড়ানি দেয়, এঃ! তর সয় না ছেমড়ির! খামখান খুলতি দে আগে। কী বাত্তা লেহিছে এট্টু পড়োদিনি মাস্টের।

খামের মুখ ছিঁড়ে, একখানা নয়, দুটো আলাদা আলাদা হাতের লেখা কাগজ বের করে রিদয়মাস্টার। খুড়োর জামাই আর শিবানী দুজনে দুটো চিঠি লিখেছে। বাসুদেবের হাতের লেখা পড়া যায়। শিবানীর হস্তাক্ষর কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং। কাকে উদ্দেশ্য করে লেখা, তারো হুদোহদিশ নেই। পড়বার সুবিধার জন্যে বাসুদেবের চিঠি প্রথমে পড়তে শুরু করল রিদয়। কপালে হাত ঠেকিয়ে জগা বিড়বিড় করে, ঠাউর! কল্যাণ করো!

[বাসুদেবের পত্র]

পরম পূজনীয় মহাশয়,

শতকোটি প্রণামান্তে নিবেদন, বিবাহের পর আমি পত্র লিখিব মনস্থ করিয়াও পারি নাই। বেবসার কারণে বিলম্ব হৈল। মহাজনের দেনার দায়ে লাটে উঠিবার দশা। উহারা আমাকে জেহেলও খাটাইয়াছে। এদিকে সমাচার এই যে শিবানী পুকুরঘাটে একসিডেন করিয়া গভ্ভোপাত ঘটাইল। আমাকে অনাথ বানাইয়া বিদায় হৈল। বংশরক্ষার কি হৈল? আপনি অনুমতি করিলে পুনর্বার ভাগ্য-পরীক্ষা করিতে পারি। তবে কিনা আমি বড়ই অভাগা সন্তান।

পুনশ্চ: দাহকার্য্য করিয়া ঘরে ফিরিলে শিবানীর হাতবাক্সে এই চিঠিখানি দেখিলাম। বোধায় আপনাকে লেখা।

অপরাধ মার্জনা করিবেন।

ইতি

আপনকার জামাতা

বাসুদেব

শিবানীর নাম ধরে কাঁদতে কাঁদতে জগা মণ্ডল চেতনা হারানোর দশা। স্বর্ণ আছাড়িবিছাড়ি খায় মাটিতে। রিদয়ের এদিকে বাড়ি যাবার তাড়া। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। বিনা বাক্যব্যয়ে বাকি চিঠিখানা পড়তে শুরু করে দিল:

[শিবানীর পত্র]

ও শোনা ভাই যাবা? যাবা আমার বাপের দ্যাশে? এহানেত্তে দূর বেশি না। ব্যান্নে খায়ে রওনা দিলি সন্ধ্যে নাগাত পেঁছানি যায়। শুনছি বাপের শরীল খারাপ, কাশতি কাশতি জান বুঝি যায়। ও শোনা ভাই, যাওনা যাওনা একবার দেইখা আসো। বাপটা আমার একলা ভীষণ। কী খায় না খায়। হয়তো দু’ডো শুকনো চিড়ে। হায়রে আমার রাক্ষুসী প্যাট তারে থুয়ে একলা এনি...

ও ভাই তোমার পায় পড়ি গো বালা জোড়া বাঁধা থুইয়ে হাড়ি ভরে মিঠাই নিও। ওর জামাইরে কইও না য্যান। বাপটা আমার মিঠাই পাগল রসগোল্লা, বুন্দেভাজা কী ভালো পায়! আমি আবার গুড়ির গজা। হাটবারের দিন খালের পাড়ে ঐ যে বাঁশের চারখানা না? ওর উপরেই থাকতাম চায়ে - চারের থেয়ে দিব্যি খালের তল দেহা যায়। জলের মধ্যে শোল পুনাগো দল দেহা যায়। এহোনো য্যান চোখ মেললিই দেখতি পারি বাপে আমার গজার ঠুংয়া হাত উঁচোয়ে চানের মতো হাসতি হাসতি বৈঠা নাচায়।

ও সোনা ভাই, যাবানে তো? তুমি ছাড়া কই কারে কও! উনার আবার দিব্যি দিয়া ভুলিও য্যান বাপের কথা কইনে তারে। কতদিন তার মুখ দেহিনে। শরীল কি আর শরীল আছে? শুনছি শ্বাসে টান বাড়িছে। কে জানে সে কী আজাব সয়? আপাং পাতায় ত্যাল মাহায়ে কে বুহি বা ছ্যাক ডলে দ্যায়? আছে তো এক খেন্তি খুড়ি, সেই-ই মরে তার মাজার ব্যথায়!

ও সোনা ভাই, দুইচারি দিন থাকবানে তো? গাঁওডা কিন্তু ভালই আছে। খেন্তি খুড়ির বকনা বোধ হয় এতদিনি বাছুর দিছে। তুমি গেলি দুধ পাবানে। ওর গলায় যে ঘন্টা ডা-না এই আমার নিজির হাতে বান্ধে দিয়া বকনাডারে হাতে ধইরে কতদিন যে মাঠে চরাইছি। কুটোর গাদায় কোলে কোরে শুয়ে শুয়ে রোদ পুহাইছি। একদিন কি হইলো জানো? ঐ পাড়ার ঐ পোটলার বাপ এই মোটা এক কচা ভাংয়ে পাও জড়ায়ে আঘাই দেলো। আহা রে সে কী যন্ত্রণা অমোন টানা চক্ষু বায়ে দরদরায়ে...আমি আর ও বুক জড়ায়ে কী যে কান্দোন কান্দিছিলাম।

ধুত্্তুরি ছাই! কি কতি যে কি কথা কই! তুমি কিন্তু যাচ্ছো কলাম। কেমন জানি বাপের গলা, নুরী নুরী ঐ যে ডাহে। শুনলি পরে বুহির মধ্যি এমন জোরে মোচড় মারে! তুমিও কি শুনতি পারো! ঐ যে আবার নুরী নুরী...ও কি তুমার চোখ ভিজা ক্যান? তুমার হাতে কিসির চিটি? কওদি আমার কলজেখানি পুড়ছে ভারি, ও কি আমার বাপের খবর? কওনা, কওনা সে ক্যামোন আছে? শ্বাস-কাশে কি বিরাম দিছে? কত জোনরে কত কলাম কেউ দেলো না খবর আনে। কয়দিন যে কি লাগতিছে, কোন ভাষাদে বুঝোই কারে?

ও সোনা ভাই, কওনা খুলে বাপে আমার ক্যামোন আছে?

হাঁপানীর টান চড়ে যাওয়ায় জগাবুড়ো বাকরহিত। স্বর্ণের গলায় করুণ ডুকরানি। রিদয়মাস্টার চিঠি শেষ করে আপনমনে বলে, আহা! মায়ের বুলি - মধুর বুলি!

বনের মধ্যে কোথাও সেই রহস্যপাখি অশুভ ডাক ডেকে ওঠে।

বি.দ্র. এ গল্পের দ্বিতীয় চিঠির মূল লেখক অনন্যা রানী মণ্ডল। খুলনার বটিয়াঘাটা সাহিত্যচক্র থেকে প্রকাশিত ‘উজান বৈঠা’ (ডিসেম্বর ২০১৩) সংকলনে ‘আকুতি’ নামে ছাপা হয়েছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়