গাজী মোঃ শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ
১০ সন্তানের জনক-জননী, তবু ভাগ্যে জোটে না দুবেলা অন্ন!

"আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও, রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও..."। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবিতার সেই অবর্ণনীয় কষ্টের 'আসমানি' যেন আজ রূপ বদলে বেঁচে আছেন সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে। তবে এই বাস্তবতার আসমানি একা নন, সাথে আছেন তাঁর ৯০ বছর বয়সী বৃদ্ধ স্বামীও। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে বাবা-মা সারাজীবন নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন। দিনের পর দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে গড়ে তোলেন তাদের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই নাড়িছেঁড়া সন্তানরাই যদি জীবনের শেষ অপরাহ্নে এসে বাবা-মায়ের পাশে না দাঁড়ায়, তবে তার চেয়ে নির্মম নিয়তি আর কী হতে পারে!
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের বানিয়াগাঁতী গ্রামের ৯০ বছর বয়সী আছাব আলী ও তাঁর ৮০ বছর বয়সী স্ত্রী সালেকা বেগমের জীবন যেন আজ সেই বুকফাটা বাস্তবতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়েসহ ১০ সন্তানের বিশাল সংসার তাঁদের। কিন্তু এই এক ডজন সদস্যের পরিবারেও আজ বৃদ্ধ দম্পতির কপালে জোটে না দুবেলা অন্ন। জরাজীর্ণ ঘরে আজ তাঁরা শুধুই মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।
১০ প্রদীপের নিচে ঘুটঘুটে অন্ধকার
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সন্তানদের মানুষ করতে জীবনের সবটুকু রক্ত-পানি উজাড় করে দিয়েছিলেন আছাব আলী। কষ্ট করে বড় করেছেন, সংসার গুছিয়েছেন, ধুমধাম করে বিয়েও দিয়েছেন। অথচ আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই ১০ সন্তানের অধিকাংশই বাবা-মায়ের খোঁজ নেওয়া তো দূর, একমুঠো ভাত দিতেও অস্বীকৃতি জানান।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ আছাব আলী এখন প্রায় পঙ্গু। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়েছেন অনেক আগেই। অন্যদিকে, নানা শারীরিক জটিলতা সত্ত্বেও নিজের রোগ-শোক ভুলে স্বামীর সেবাযত্নে দিনরাত পার করছেন বৃদ্ধা সালেকা বেগম। কখনো স্বামীকে ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে আসেন, আবার কখনো দুমুঠো অন্নের খোঁজে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে হাত পাতেন।
ভাঙা ঘরে দীর্ঘশ্বাসের রাত
দারিদ্র্যের নির্মমতার এক চরম দলিল যেন এই বৃদ্ধ দম্পতির ছোট্ট বসতঘরটি। জরাজীর্ণ টিনের চাল আর ছেঁড়া চটের বেড়া। বর্ষা এলেই ঘরের ভেতর বৃষ্টির পানি টপটপ করে পড়ে। ঘরে নেই কোনো ভালো আসবাবপত্র, শোয়ার জন্য একটি খাটও ভাগ্যে জোটেনি। বাঁশের তৈরি একটি ভাঙা মাচার ওপর চট বিছিয়ে কোনোমতে রাত কাটান তাঁরা। বয়সের ভার আর অসুস্থতার যন্ত্রণায় প্রতিটি রাত যেন তাঁদের কাছে এক একটি দীর্ঘশ্বাসের অনন্ত অধ্যায়।
প্রতিবেশী মরিয়ম বেগম চোখের পানি ধরে রাখতে না পেরে বলেন, "চাচা-চাচিকে এই কষ্টে দেখতে বুকটা ফেটে যায়। আমরা প্রতিবেশীরা যার যা সামর্থ্য আছে, তাই দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করি। কিন্তু এভাবে তো আর কতদিন চলে? ১০ জন ছেলেমেয়ে থাকতে কেন তারা মানুষের দয়ায় বাঁচবে?"
আরেক প্রতিবেশী কামাল শেখ ও জুরান আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "১০টি সন্তানকে এত কষ্ট করে বড় করার পর এই বয়সে তাঁদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সন্তানদের ভালোবাসা ও যত্ন। কিন্তু তারা পেয়েছেন শুধু চরম অবহেলা। এই পাপ সমাজ মেনে নিতে পারে না।"
মানবতার হাত ও সরকারি সহায়তা
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. সোহাগ মণ্ডল জানান, "আমরা উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আছাব আলী ও সালেকা দম্পতির নামে বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দিয়েছি। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও নিয়মিত সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, ১০টি সন্তান থাকা সত্ত্বেও শেষ বয়সে তাঁদের দেখার কেউ নেই। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে এই দম্পতি অন্তত একটু স্বস্তি পেতেন।"
এদিকে এই অসহায় দম্পতির পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস। তিনি বলেন, "আমরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সবার সহযোগিতায় অন্তত ৭০ হাজার টাকা ফান্ড সংগ্রহের চেষ্টা করছি। এই টাকা দিয়ে তাঁদের জন্য একটি চলাচলের উপযোগী হুইলচেয়ার, খাদ্যসামগ্রী এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। মানুষ মানুষের জন্য—এই বিশ্বাস থেকেই আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।"
শেষ আকুতি
অশ্রুসিক্ত চোখে, কাঁপানো কণ্ঠে বৃদ্ধা সালেকা বেগম জীবনের শেষ চাওয়াটুকু জানিয়ে বলেন, "আমরা আর কিছু চাই না বাবা। শুধু দুবেলা একটু শান্তিতে ভাত খেয়ে বাকি জীবনটা পার করতে চাই। আল্লাহ যেন আমাদের সন্তানদের ভালো রাখেন।"
একসময় যে হাত ১০ সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছিল, আজ সেই হাতই প্রসারিত হয়েছে মানুষের সহানুভূতির আশায়। যে চোখ একদিন সন্তানদের সুখী জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল, আজ সেই চোখে জমেছে শুধুই অসহায়ত্বের অশ্রু। আমাদের সামান্য সহানুভূতি ও একটু সাহায্যের হাতই পারে এই অবহেলিত বাবা-মায়ের জীবনের শেষ দিনগুলোতে একটুখানি স্বস্তি ও হারিয়ে যাওয়া হাসি ফিরিয়ে দিতে।
পিডিএস/এমএইউ









































