reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১৭ জুলাই, ২০২৬

উজানের ঢল ও অতিবৃষ্টির দ্বিমুখী থাবা

উত্তরবঙ্গে আমন রোপণে ধীরগতি, নতুন বন্যার শঙ্কা  

প্রকৃতির বৈরিতায় থমকে গেছে প্রাণস্পন্দন

দেশের মূল খাদ্যভাণ্ডার ও শস্যভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে এই সময়ে গ্রামীণ জনপদ মুখরিত থাকার কথা ছিল আমন ধানের চারা রোপণের উৎসবে। বর্ষার নতুন পানিতে মাঠঘাট যখন উর্বর, তখন কৃষকের ব্যস্ত থাকার কথা ছিল কাকডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাল চাষ আর চারা রোপণে। কিন্তু চলতি মৌসুমে প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত ও বৈরী আচরণ উত্তরাঞ্চলের কৃষি খাতকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

একদিকে মৌসুমের শুরুতেই টানা ভারি বর্ষণ ও হিমালয় পাদদেশ থেকে নেমে আসা আকস্মিক উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি ও বীজতলা। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নতুন লঘুচাপের প্রণোদনায় উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদ-নদীর পানি পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে পাঁচ জেলায় নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অতিবৃষ্টি এবং বন্যার এই দ্বিমুখী থাবায় উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে, যার ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক ধীরগতিতে চলছে আমনের চারা রোপণ।

আমন রোপণের বর্তমান চিত্র: রংপুর কৃষি অঞ্চলের উপপরিচালকের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ সরকারি তথ্য ও মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমন মৌসুমের শুরুতে চাষাবাদের গতি আশঙ্কাজনকভাবে কম। চলতি কৃষি মৌসুমে তিস্তা, ধরলা, ঘাঘট এবং দুধকুমার নদীর অববাহিকায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং নদীর পানি উপচে পড়ার কারণে কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার কৃষকরা এখনো মাঠেই নামতে পারেননি। বহু এলাকায় বীজতলা তৈরি হলেও তা পানির নিচে পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

কৃষি বিভাগের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বুধবার বিকেল পর্যন্ত রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলার মধ্যে মাত্র তিনটিতে আংশিকভাবে আমনের চারা রোপণ শুরু করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে নীলফামারী জেলায় ১৬ হাজার ৩৯৫ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৬ হাজার ৩২০ হেক্টর, রংপুরে মাত্র ৯০০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ শুরু হয়েছে।

তিনটি জেলায় মোট ২৩ হাজার ৬১৫ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে, যা এই মৌসুমের স্বাভাবিক গতির তুলনায় অত্যন্ত কম। সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলায়, যেখানে বন্যার পানি স্থায়ী রূপ নেওয়ায় এখন পর্যন্ত চারা রোপণের খাতা খোলাই সম্ভব হয়নি। অনেক এলাকায় কৃষকরা ধারদেনা করে যে চারা রোপণ করেছিলেন, তাও টানা কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের নিষ্ঠুর প্রহার: জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব যে কতটা বাস্তব এবং তা কীভাবে প্রান্তিক কৃষকদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে, তা উত্তরবঙ্গের কৃষকদের সাথে কথা বললেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঋতুচক্রের এই আকস্মিক ও খামখেয়ালি পরিবর্তন তাদের দীর্ঘদিনের চেনা কৃষিপদ্ধতিকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দিয়েছে।

নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার বাইশপুকুর গ্রামের কৃষক শফিউদ্দিন (৪৮) দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘গত দুদিন ধরে আবাদি জমি থেকে বৃষ্টির পানি খুব ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। আমরা চারা নিয়ে তৈরি আছি; কিন্তু পানি পুরোপুরি না নামলে তো জমিতে হাল চাষ দেওয়া যাবে না। আর কতদিন এই চারা টিকবে, তাও জানি না।’

বাইশপুকুর গ্রামের অপর প্রান্তে লালমনিরহাটের দোয়ানী এলাকার ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ কৃষক নজরুল ইসলাম তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘সাধারণত প্রতি বছর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে আমরা মাঠে চারা রোপণ নিয়ে তীব্র ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত দম ফেলার ফুসরত থাকে না। কিন্তু এবার তিস্তার উজানের ঢল আর অসময়ের ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে আমাদের সব জমি মাসের পর মাস তলিয়ে আছে। ফলে হাল চাষ করাই যাচ্ছে না। যদি আগামী এক সপ্তাহ বৃষ্টিপাত না কমে এবং রোদ না পাওয়া যায়, তবে এবার আমন চাষ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।’

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কচুয়া এলাকার ৪২ বছর বয়সি কৃষক সন্তোষ চন্দ্র সেন জলবায়ুর এই পরিবর্তনের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘গত বছর ঠিক এই সময়ে বৃষ্টির এক ফোঁটা পানিও ছিল না। খরার কারণে আমরা আমনের চারা রোপণ করতে পারছিলাম না। বাধ্য হয়ে হাজার হাজার টাকা খরচ করে শ্যালো মেশিন দিয়ে মাটির নিচ থেকে পানি তুলে চাষ করতে হয়েছিল। আর এবার বিধাতা এত পানি দিয়েছেন যে জমিতে হাল চাষ বা চারা রোপণ করাই যাচ্ছে না। আগামী দুই-তিন দিন যদি ভারি বৃষ্টি না হয় এবং মাঠের পানি নেমে যায়, তবেই আমরা হাল চাষ শুরু করতে পারব।’

নীলফামারী সদরের গোড়গ্রাম হাজিপাড়া গ্রামের ৫৫ বছর বয়সি প্রবীণ কৃষক লিয়াকত আলী জানান, এলাকার কেবল উঁচু জমিগুলোতে কোনোমতে চারা রোপণ চলছে। তবে নিচু জমিগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ, সেখানে বৃষ্টির পানি ভরাট হয়ে থাকায় চারা রোপণে দীর্ঘ সময় বিলম্ব হচ্ছে, যা ফলনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

লক্ষ্যমাত্রা ও উৎপাদন পরিকল্পনা: প্রকৃতির এই চরম প্রতিকূলতার মাঝেও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় মোট ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জেলাওয়ারী আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা: রংপুর জেলায় ১ লাখ ৬১ হাজার ৯৫০ হেক্টর, গাইবান্ধায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩০ হেক্টর, কুড়িগ্রামে ১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ হেক্টর, নীলফামারীতে ১ লাখ ১৩ হাজার ২২০ হেক্টর এবং লালমনিরহাটে ৮৬ হাজার ৬৫০ হেক্টর। এই বিশাল পরিমাণ কৃষিজমি থেকে মোট ৩০ লাখ ১ হাজার ৫৪২ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চালের আকারে হিসাব করলে দাঁড়ায় ২০ লাখ ৫ হাজার ২৮ টন। উৎপাদনশীলতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে কৃষি বিভাগ সনাতন পদ্ধতির চেয়ে আধুনিক ও উচ্চফলনশীল জাতের ওপর বেশি জোর দিয়েছে। পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে—৫ লাখ ২৪ হাজার ৫২০ হেক্টর জমিতে উচ্চফলনশীল (HYV) জাত, ৮৬ হাজার ২০ হেক্টরে হাইব্রিড জাত এবং মাত্র ১১ হাজার ১০ হেক্টরে স্থানীয় জাতের আমন চাষ করা।

উল্লেখ্য, গত বছর এই অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ৬ লাখ ২০ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ করা হয়েছিল এবং চালের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৭২ টন। সেই তুলনায় এবার ৯০০ হেক্টর বেশি জমিতে আমন চাষের পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও গতবারের চেয়ে ৮৭ হাজার ৩৫৬ টন চাল বেশি ধরা হয়েছে। ফলে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা এখন কৃষি বিভাগের জন্য এক বড় পরীক্ষা।

নতুন দুর্যোগের মেঘ: উত্তরবঙ্গের ৫ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা: কৃষকদের এই বিদ্যমান সংকটের ওপর নতুন করে আঘাত হানতে চলেছে আবহাওয়া ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির পূর্বাভাস। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ নিয়মিত বুলেটিনে জানানো হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যদিও গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি কিছুটা কমেছিল; কিন্তু আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী তিন দিনে এই নদীগুলোর পানি আবার ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে। কয়েকটি পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে

লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলগুলোতে একটি স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। একই সাথে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির ধারা আগামী পাঁচ দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া জেলার কিছু স্থানে নদীর পানি সতর্কসীমা স্পর্শ করবে এবং নদী অববাহিকার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে কৃষিজমি পুনরায় তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এই নতুন বন্যার পূর্বাভাস কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর করে তুলেছে।

সংকট উত্তরণে সরকারি পদক্ষেপ ও আউশ ধানের বিকল্প ভূমিকা: এই মহাসংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখেও আশা ছাড়ছেন না কৃষি কর্মকর্তারা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকৃতির কারণে প্রথম দিকে কিছুটা বিলম্ব হলেও আমন ধানের একটি বড় সুবিধা হলো যে, আগস্টের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এর চারা রোপণ করা যায়। তাই কৃষকদের এখনো আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। পানি নেমে গেলেই আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে দ্রুত চারা রোপণ সম্পন্ন করা হবে।’

তিনি আরও জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করতে এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা বলয় অক্ষুণ্ণ রাখতে সরকার বেশ কিছু বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষকদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারি প্রণোদনার আওতায় বিনামূল্যে উচ্চফলনশীল আমন বীজ এবং সুষম রাসায়নিক সার বিতরণ করা হচ্ছে। বোরো ধান কাটার পর এবং আমন ধান রোপণের মধ্যবর্তী সময়ে জমি যেন পতিত না থাকে, সে জন্য কম সেচের পানি ব্যবহার করে স্বল্পমেয়াদি সম্পূরক ফসল হিসেবে আউশ ধানের চাষ বাড়ানো হয়েছে। ইতোমধ্যে এই অঞ্চলে ৫৯ হাজার ১৯৫ হেক্টর জমিতে আউশ চাষ সম্পন্ন হয়েছে, যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৭৯ হাজার ১৬১ টন চাল। কৃষকরা আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে এই আউশ ধান ঘরে তুলবেন এবং কৃষি বিভাগ পরামর্শ দিয়েছে আউশ কাটার পরপরই যেন সেই জমিতে দ্রুত আমন রোপণ করা হয়।

পুনর্বাসন ও নিবিড় তদারকিই একমাত্র পথ: উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের চঞ্চল প্রকৃতির সাথে লড়াই করেই এ অঞ্চলের মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো—বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কৃষকদের মাঝে বিকল্প চারা বা আমনের বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা। একই সাথে লঘুচাপের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতিতে কৃষকরা যেন মাঠপর্যায়ে সঠিক কারিগরি পরামর্শ পান, সে জন্য কৃষি কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি সহায়তা যদি সঠিক সময়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে পৌঁছায়, তবে সমস্ত প্রাকৃতিক বাধা পেরিয়ে উত্তরবঙ্গ এবারও আমনের রেকর্ড উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারবে—এমনটাই প্রত্যাশা দেশের কৃষি বিশেষজ্ঞদের।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়