ফাইনাল খেলার টিকিটের দাম চড়া, ভাঙল রেকর্ড
ফুটবলপ্রেমীরা দিশাহারা

স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ঘিরে টিকিটের দাম নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছেছে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠাতব্য এই ম্যাচের টিকিটের গড় মূল্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ইভেন্টের রেকর্ড গড়েছে। ফলে এনএফএল সুপার বোল ও এনবিএ ফাইনালের টিকিটের দামকেও ছাড়িয়ে গেছে বিশ্বকাপের ফাইনাল।
২০২৬ সালের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় (১৯ জুলাই রাত ১টায় বা রাত ১২টার পর, যা ২০ তারিখের প্রথম প্রহরে পড়ে)।
টিকিট বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম টিকপিকের তথ্য অনুযায়ী, ফিফার শেষ মুহূর্তের বিক্রয় সাইটে কেবল ‘ফ্রন্ট ক্যাটাগরি–১’-এর সীমিতসংখ্যক টিকিট অবশিষ্ট রয়েছে। শুক্রবার পর্যন্ত প্রতিটি টিকিটের মূল্য ছিল ৩০ হাজার মার্কিন ডলার।
ফিফার আনুষ্ঠানিক রিসেল প্ল্যাটফর্মেও টিকিটের দাম অত্যন্ত বেশি। সেখানে ক্যাটাগরি–৩ এর সবচেয়ে কম দামের টিকিটের মূল্য প্রায় ৮ হাজার ডলার। ক্যাটাগরি–১ এর টিকিট শুরু হচ্ছে ১১ হাজার ৭০০ ডলার থেকে। অন্যদিকে ফ্রন্ট ক্যাটাগরি–১ এর টিকিট কিনতে গুনতে হচ্ছে অন্তত ১৭ হাজার ২০০ ডলার। হুইলচেয়ার ও সহজ প্রবেশাধিকার বিভাগের টিকিটের দামও ১৪ হাজার থেকে ২০ হাজার ডলারের মধ্যে।
তবে বেসরকারি রিসেল প্ল্যাটফর্মে দাম আরও বিস্ময়কর। সেখানে ক্যাটাগরি–১ এর একটি টিকিটের মূল্য ৫ লাখ ৭৫ হাজার ডলার, ফ্রন্ট ক্যাটাগরি–১ এর টিকিট ৫ লাখ ৯৫ হাজার ডলার এবং ক্যাটাগরি–৩ এর একটি আসনের মূল্য সর্বোচ্চ ২৩ লাখ ডলার পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। যদিও এসব দামে টিকিট বিক্রি হবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়। তবুও চলতি বিশ্বকাপে টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তুলনামূলকভাবে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এনএফএল সুপার বোলের টিকিটের সর্বনিম্ন মূল্য ম্যাচের তিন দিন আগে ছিল প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ডলার। আর জুনে অনুষ্ঠিত এনবিএ ফাইনালের একটি ম্যাচের টিকিট শুরু হয়েছিল প্রায় ৭ হাজার ডলার থেকে।
বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রিতে ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতি চালু করায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। এই পদ্ধতিতে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকিটের দামও বাড়তে থাকে।
এপ্রিল মাসে টিকিট বিক্রির চতুর্থ ধাপে ক্যাটাগরি–১-এর টিকিটের প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১০ হাজার ৯৯০ ডলার, যা আগের বছরের অক্টোবরের শুরুর দামের তুলনায় ৭০ শতাংশেরও বেশি বেশি। একইভাবে ক্যাটাগরি–২ ও ক্যাটাগরি–৩-এর টিকিটের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দাম ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের গড় টিকিট মূল্যের তুলনায় চার থেকে ছয় গুণ বেশি ছিল। এরপর ফাইনাল যত ঘনিয়ে এসেছে, টিকিটের মূল্যও তত বেড়েছে।
এদিকে, ফাইনালের টিকিটের চড়া দাম নিয়ে যখন সাধারণ ফুটবলপ্রেমীরা দিশাহারা, তখন এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন একদল প্রযুক্তিপ্রেমী রেডিট ব্যবহারকারী। আর/ওয়ার্ল্ডকাপ২০২৬টিকিটস নামের একটি সাব-রেডিটে যুক্ত হওয়া প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার সদস্য এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে টিকিটের কালোবাজারি চক্রকে কোণঠাসা করে ফেলছেন।
বিষয়টি অনেকটা ২০২১ সালের সেই বিখ্যাত গেমস্টপ আন্দোলনের মতো। ওই সময় ওয়ালস্ট্রিট বেটস ব্যবহারকারীরা যেমন বড় বড় বিনিয়োগকারীর বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি এবার ফুটবল–ভক্তরা ফিফা এবং কালোবাজারিদের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করছেন। এই আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার হলো সিটসাইডকিক নামক একটি স্বয়ংক্রিয় টুল। লুক নামের শিকাগোর এক বাসিন্দা এটি তৈরি করেছেন। এআই সেবা ক্লড কোডের সাহায্যে মাত্র পাঁচ দিনে তৈরি করা এই ওয়েবসাইট চালু হওয়ার এক মাসের মধ্যেই প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার মানুষ ব্যবহার করেছেন। এই টুল ফিফার টিকেটিং ওয়েবসাইটের ব্যাকএন্ড স্ক্যান করে রিয়েল-টাইমে টিকিটের প্রাপ্যতা এবং দামের তথ্য সাধারণ ভক্তদের সামনে তুলে ধরে। ফলে কোন স্টেডিয়ামের কোন ব্লকের টিকিট এখন সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে, তা সহজেই জানতে পারছেন ভক্তরা।
ভক্তদের এমন প্রতিরোধে ফিফার টিকেটিং কৌশলে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। যেখানে ফিফা কোনো টিকিট বিক্রিতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন হাতিয়ে নিচ্ছে, সেখানে রেডিট ব্যবহারকারীরা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি লেনদেনের ব্যাক-চ্যানেল তৈরি করে এই বাড়তি খরচ এড়াচ্ছেন। এমনকি এই গ্রুপগুলোতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লেনদেন হচ্ছে। কোলম্যান নামের একজন মডারেটর জানান তিনি নিজে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চারটি টিকেট প্রতিটা ৫০০ ডলার করে কিনেন। এসব টিকেট ওয়েবসাইটে প্রথমে ৮০০ ডলার করে বিক্রি হয়েছিল। পরে তা ৯২০ ডলার করে বিক্রি করা হয়। এআই টুলের কারণে তার প্রায় ১ হাজার ৬৮০ ডলার সাশ্রয় হয়।
ফিফার বিরুদ্ধে ভক্তদের অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। তাদের দাবি, সংস্থাটি ইচ্ছাকৃতভাবে টিকিটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। টিকিটের দাম নির্ধারণে তারা ডায়নামিক প্রাইসিং এবং আনক্যাপড রিসেল লিস্টিং ব্যবহার করছে, যার ফলে ফাইনাল ম্যাচের টিকিটের দাম কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ইতোমধ্যে এই অস্বচ্ছ টিকেটিং প্রক্রিয়ার অভিযোগে নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সির অ্যাটর্নি জেনারেল ফিফাকে সমন পাঠিয়েছেন। ইউসিএলের বিজনেস সাইকোলজির অধ্যাপক টমাস চামোরো-প্রেমুজিচের মতে, ফুটবল–ভক্তদের এই প্রযুক্তিনির্ভর লড়াই এআই যুগের এক নতুন দৃষ্টান্ত। এটি মানুষ ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এখন মানুষ এমন প্রযুক্তি তৈরি করছে, যা মোকাবিলা করতে ফিফার মতো বড় সংস্থাগুলোকেও আরও উন্নত এআই ব্যবহারের প্রয়োজন হবে।
যদিও ফিফা বারবার তাদের ওয়েবসাইট থেকে ডেটা সংগ্রহের পথ বন্ধ করার চেষ্টা করছে, তবে উদ্ভাবনী ভক্তরা প্রতিবারই নতুন কোনো পথ খুঁজে বের করছেন। এই ডিজিটাল লড়াইয়ের ফলে অনেক মারকিউ ম্যাচের টিকিটের দামও এখন আগের তুলনায় অনেক নিচে নেমে এসেছে। উদ্ভাবক লুক নিজেই এই পরিস্থিতির শিকার হয়ে একটি ম্যাচের টিকিট চড়া দামে কিনেছিলেন, কিন্তু তার তৈরি টুলটি এখন অন্যদের সঠিক দামে টিকিট পেতে সাহায্য করছে। রেডডিট ব্যবহারকারীদের এই সম্মিলিত প্রতিরোধ প্রমাণ করে দিয়েছে, বড় বড় সংস্থার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ ভক্তরা এখন কতটা প্রযুক্তিসচেতন এবং সংগঠিত।
সূত্র: ওয়্যার্ড ডটকম









































