নেপালের রাজনীতি: পরিবর্তনের ১০০ দিনেই মোহভঙ্গ!

নেপালের রাজনীতিতে গত দশ মাস এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে চাওয়া নেপালের জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্ম একসময় যে উদ্দীপনা নিয়ে র্যাপার বালেন শাহকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, আজ সেই একই প্রজন্ম রাজপথে নেমে এসেছে তারই সরকারের সমালোচনায়। ক্ষমতার পালাবদলের ১০০ দিনের মাথায় কেন এই মোহভঙ্গ?
প্রত্যাশার পাহাড় বনাম বাস্তবতা: নেপালের তরুণেরা যখন বালেন শাহকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছিল, তখন তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই—বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক জঞ্জাল পরিষ্কার করা। একটি আমূল সংস্কার এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। কিন্তু ১০০ দিনের মাথায় সেই স্বপ্নের গতিপথ কিছুটা হোঁচট খেয়েছে।
ক্ষোভের প্রধান কারণসমূহ:
পুনর্বাসনহীন উচ্ছেদ অভিযান: নদী তীরবর্তী এলাকায় অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করা সরকারের একটি সাহসী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও, পুনর্বাসনের বিকল্প ব্যবস্থা না করায় তা অমানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। হাজার হাজার পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে, যা তরুণদের মানবিক মূল্যবোধে আঘাত করেছে।
প্রশাসনিক অসহিষ্ণুতা: গত ৯ জুলাই এক রাইড-শেয়ারিং চালকের আত্মাহুতির ঘটনা প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যকার গভীর দূরত্বের জানান দেয়। ট্রাফিক পুলিশ ও পৌর পুলিশের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা এবং সাধারণ মানুষের সাথে অসদাচরণ এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ: সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় অবরুদ্ধ করার মতো ঘটনা সরকারের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। সমালোচকদের দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রের এই ব্যবহারের সমালোচনা এখন জনমতের কেন্দ্রে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি: দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ফসল হিসেবে এই সরকার ক্ষমতায় এলেও, অনেক বড় দুর্নীতির মামলায় কাঙ্ক্ষিত বিচার না পাওয়া এবং জামিনের ঘটনা তরুণদের মনে এক ধরণের হতাশা ও আস্থাহীনতা তৈরি করেছে।
জেন-জি প্রজন্মের দর্শন: এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তরুণরা স্পষ্ট করেছে যে তারা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে পূজা করার জন্য সরকার পরিবর্তন করেনি। তাদের এই দ্রুত রাজপথে নেমে আসার অর্থ এই নয় যে তাদের রাজনৈতিক পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছে; বরং এটি প্রমাণ করে যে, এই সরকার জবাবদিহি করতে বাধ্য। তারা এমন একটি প্রশাসন চায়, যেখানে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর শোনার মতো কান থাকবে।
উত্তরণের পথ: বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণে বালেন শাহকে ভুল স্বীকার করে নিজেকে সংশোধন করা। উচ্ছেদ অভিযানের ধারাবাহিকতায় না গিয়ে পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা। পৌর ও ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে আইনি জটিলতা নিরসন করে সাধারণ মানুষের হয়রানি কমানো। গণমাধ্যমের ওপর যে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি শুধুমাত্র কাগজে না রেখে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা।
নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণেরা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে এবং একই সাথে সেই পরিবর্তনের পাহারা দিচ্ছে। সরকার যদি হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে মানুষের যৌক্তিক দাবির প্রতি সংবেদনশীল হয়, তবেই এই রাজনৈতিক পরীক্ষা সফল হবে। অন্যথায়, যে প্রত্যাশা নিয়ে এই সরকার ক্ষমতায় এসেছিল, তা দ্রুতই বিলীন হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।









































