reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ২ ঘণ্টা আগে

সাগরে সলিল সমাধি ৫৩০ রোহিঙ্গার, উত্তাল ঢেউয়ে ডুবল স্বপ্নযাত্রা

নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় মৃত্যুঝুঁকির যাত্রা

দুটি নৌকা নৌকায় ছিল অন্তত ৫৩০ জন; সঙ্গে ছিল অসংখ্য স্বপ্ন, ভয়, কান্না আর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু বিশাল সমুদ্রের বুকে মিলিয়ে গেছে তাদের সবকিছু। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল তারা।

প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তাদের কোনো খোঁজ মেলেনি। মানবাধিকারকর্মী ও পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, উত্তাল সাগর আর বৈরী আবহাওয়ার কাছে হার মেনেছে নৌকা দুটি। সত্যিই যদি তা হয়ে থাকে, তবে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ রোহিঙ্গা সমুদ্র বিপর্যয়ের সাক্ষী হতে পারে বিশ্ব।

নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় মৃত্যুঝুঁকির যাত্রা গত ২৯ জুন রাখাইনের সিন টেট মাও এলাকা থেকে দুটি নৌকা যাত্রা শুরু করে। একটি সকালে, অন্যটি সন্ধ্যায়। বহুদিনের পুরোনো মাছ ধরার ট্রলারকে পরিবর্তন করে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের উপযোগী করা হয়েছিল। কিন্তু বর্ষাকালের উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার মতো সক্ষমতা সেই নৌকাগুলোর ছিল না।

দুর্বল ইঞ্জিন, অতিরিক্ত যাত্রী, সীমিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া—সব মিলিয়ে শুরু থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এই যাত্রা। তবুও জীবনের সব ঝুঁকি মাথায় নিয়েই রওনা হয় শত শত রোহিঙ্গা। কারণ তাদের কাছে সামনে ছিল অনিশ্চিত জীবন, আর সমুদ্রের ওপারে ছিল নতুন আশার হাতছানি।

তিন সপ্তাহেও ফিরল না কোনো খবর রাখাইন নিয়ে কাজ করা গবেষণা উদ্যোগের পরিচালক ক্রিস লেওয়া বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েছেন যে, নৌকা দুটি সত্যিই যাত্রা করেছিল। কিন্তু এরপর কী ঘটেছে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

রাখাইনে চলমান সংঘাতের কারণে প্রায় সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সাধারণত যাত্রার কয়েক দিনের মধ্যেই যাত্রীরা কোনো না কোনোভাবে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু এবার তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনো বার্তা আসেনি। কোনো নৌকা গন্তব্যে পৌঁছায়নি, কেউ ফিরে আসেনি, এমনকি কোনো জীবিত যাত্রীর সন্ধানও মেলেনি। এই দীর্ঘ নীরবতাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

ভেসে ওঠা মরদেহে বাড়ছে শঙ্কা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার মধ্যেই বাংলাদেশ উপকূলে এক রোহিঙ্গা নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলে জেলেরা আরও কয়েকটি মরদেহ ভাসতে দেখেছেন।

যদিও এসব মরদেহ নিখোঁজ নৌকার যাত্রীদের কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবুও ঘটনাগুলো নতুন করে শঙ্কা বাড়িয়েছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, একটি নৌকা যাত্রার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডুবে যায়। অন্যটি কয়েক দিন সমুদ্রে ভেসে থাকার পর বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে তলিয়ে যেতে পারে। এখনো পর্যন্ত কোনো উদ্ধার অভিযান থেকে জীবিত কাউকে পাওয়ার খবর মেলেনি।

কেন জীবন বাজি রাখছেন রোহিঙ্গারা প্রশ্ন উঠছে, এত বড় ঝুঁকি জেনেও কেন শত শত মানুষ এমন অনিশ্চিত সমুদ্রযাত্রায় বের হন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের দীর্ঘদিনের বাস্তবতায়।

বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে বসবাস করছেন। সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসছে, নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে এবং অপরাধী চক্রের তৎপরতাও উদ্বেগজনক।

অন্যদিকে রাখাইনে থেকে যাওয়া প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গার জীবনও সমান অনিশ্চিত। চলমান সংঘাত, জোরপূর্বক নিয়োগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অনেকের কাছেই সমুদ্রপথই হয়ে উঠেছে শেষ ভরসা।

স্বপ্নের নাম মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের কাছে মালয়েশিয়া শুধু একটি দেশ নয়, বরং নিরাপদ জীবনের প্রতীক। সেখানে আগে থেকেই প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। আত্মীয়স্বজন, পরিচিত মানুষ এবং কাজের সম্ভাবনার কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই রোহিঙ্গাদের প্রধান গন্তব্য। এই সুযোগকেই কাজে লাগিয়েছে মানবপাচারকারী চক্র।

বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াজুড়ে বিস্তৃত শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা বিপুল অর্থের বিনিময়ে মানুষ পাচার করছে। জনপ্রতি প্রায় সাড়ে তিন থেকে পৌনে চার লাখ টাকার সমপরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়। অনেক পরিবার জীবনের সঞ্চয় বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে এই অর্থ জোগাড় করে।

কিন্তু অর্থ দিলেই নিরাপদ যাত্রার নিশ্চয়তা মেলে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই যাত্রাপথে নির্যাতন, জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।

সমুদ্র এখন মৃত্যুর পথ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরের জলরাশি রোহিঙ্গাদের জন্য বারবার মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই অনিরাপদ নৌকা, খাদ্য ও পানির সংকট, দুর্বল ইঞ্জিন এবং প্রতিকূল আবহাওয়া মিলিয়ে প্রতিটি যাত্রাই হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর লড়াই।

তবুও মানুষ এই পথ বেছে নেয়। কারণ তাদের কাছে পেছনে ফেরার কোনো পথ থাকে না। যারা যাত্রা শুরু করেন, তারা জানেন সামনে মৃত্যু থাকতে পারে। কিন্তু স্থলভাগে যে জীবন তাদের অপেক্ষা করছে, সেটিও অনেকের কাছে ধীরে ধীরে মৃত্যুর সমান হয়ে উঠেছে।

বাড়ছে সমুদ্রপথে যাত্রা ক্রিস লেওয়ার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ছেড়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করেছেন। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এটি প্রমাণ করে, সংকট কমার পরিবর্তে আরও গভীর হচ্ছে। নিরাপদ ভবিষ্যতের আশা যত ক্ষীণ হচ্ছে, ততই মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

সমাধানের পথ এখনো অজানা জাতিসংঘ বহুদিন ধরেই রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ যাতায়াতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতি মানবিক দায়িত্ব পালনেরও অনুরোধ জানিয়েছে।

কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো দেশ এখন পর্যন্ত সেই দায়িত্ব নিতে আগ্রহ দেখায়নি। ফলে মানবপাচারকারী চক্রের দৌরাত্ম্য কমছে না, বরং আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কেবল উদ্ধার অভিযান বা সীমান্ত নজরদারি বাড়িয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত না হলে এবং তাদের জন্য বৈধ পথ তৈরি না হলে এমন মর্মান্তিক সমুদ্রযাত্রা থামবে না।

অপেক্ষায় শত শত পরিবার আজও বহু পরিবার অপেক্ষা করছে একটি ফোন কলের জন্য, একটি বার্তার জন্য, কিংবা কোনো অলৌকিক খবরে। কেউ বিশ্বাস করতে চান না যে, প্রিয়জনেরা আর ফিরবেন না। আবার কেউ কেউ নীরবে মেনে নিতে শুরু করেছেন সবচেয়ে ভয়ংকর আশঙ্কাকে। সমুদ্র এখনো কিছু বলেনি। কিন্তু তিন সপ্তাহের নীরবতা যেন হাজারো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

৫৩০ জন মানুষের ভাগ্যে ঠিক কী ঘটেছে, তার উত্তর এখনো অজানা। তবে এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, নিপীড়ন, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মুখে মানুষ যখন সব পথ হারিয়ে ফেলে, তখন উত্তাল সমুদ্রও তার কাছে শেষ আশ্রয়ের পথ হয়ে ওঠে। আর সেই পথ অনেক সময় গন্তব্যে নয়, অজানা অতলে গিয়ে শেষ হয়।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়