মৃণাল সরকার মিলু, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)

  ১৫ ঘণ্টা আগে

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ

অবৈধ জালে বিপন্ন চলনবিলের মাছ ও জীববৈচিত্র্য

চলনবিল অঞ্চল একসময় দেশের সর্ববৃহৎ মিঠাপানির মাছের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট এবং অবৈধ জালের ব্যবহারের কারণে এর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। একসময় চলনবিলের জলাশয়ে ১৫১ প্রজাতির দেশি মাছের আবাসভূমি ছিল। কই, শিং, মাগুর, পাবদা, আইড়, বোয়াল, চিতল, ফলুই, বাচা এবং গুচি-বাইম মাছের জন্য এ অঞ্চল বিখ্যাত।

বর্ষার অথৈ জলরাশিতে যখন চলনবিল রূপ নেয় এক একটি জীবন্ত সমুদ্রে, তখন তার বুকে খেলা করে বেড়ায় শত প্রজাতির দেশীয় মাছ। কিন্তু প্রকৃতির এই অপরূপ উপহার আর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য আজ এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি। চলনবিলের বুক চিরে এক শ্রেণির অসাধু মৎস্য শিকারির পাতা নিষিদ্ধ ‘রিংজাল’ বা চায়নাদুয়ারি জালের মরণফাঁদ দিন দিন বিপন্ন করে তুলছে জলজ পরিবেশকে। নিষিদ্ধ এই জালের অবাধ ব্যবহার শুধু যে মাছের বংশ ধ্বংস করছে তা নয়, বরং পুরো চলনবিল অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যকে ঠেলে দিচ্ছে এক চরম হুমকির মুখে।

চলনবিল অঞ্চলের মৎস্যসম্পদের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারেন্ট জালের চেয়েও সূক্ষ্ম ও ভয়ংকর এই রিংজাল। আষাঢ়-শ্রাবণের নতুন পানিতে যখন ডিমওয়ালা মা মাছগুলো ডিম ছাড়ার জন্য নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। ঠিক তখনই তাড়াশসহ চলনবিলে অবাধে পেতে রাখা হচ্ছে সূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত রিংজাল। অত্যন্ত ঘন ও ক্ষুদ্র ফাঁসের এই রিংজালের গঠন এমন যে, একবার কোনো জলজপ্রাণী এর ভেতরে প্রবেশ করলে আর বের হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে রেণু পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ থেকে শুরু করে আইড়, বোয়াল, চিতল, পবদা, টেংরা বা পুঁটির মতো বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির মাছগুলো নির্বিচারে ধরা পড়ছে। এমনকি মাছের খাদ্য হিসেবে পরিচিত জলজ কীটপতঙ্গ এবং ছোট শামুক-ঝিনুকও এই জালের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রভাব শুধু মাছের সংখ্যার ওপরই পড়ছে না, বরং তা আঘাত হানছে চলনবিলের

সামগ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে। ছোট মাছ ও জলজপ্রাণীর

অভাব দেখা দেওয়ায় খাদ্যের সংকটে পড়ছে চলনবিলে আসা অতিথি পাখি এবং স্থানীয় বক, পানকৌড়ি ও চিল।

অন্যদিকে, মাছের প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় মৎস্যজীবী, যারা বংশপরম্পরায় চলনবিলের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন, তাদের ভবিষ্যৎ আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে। প্রাকৃতিক উপায়ে মাছের বংশবৃদ্ধির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় প্রতি বছরই কমছে দেশীয় মাছের উৎপাদন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের জাতীয় পুষ্টি চাহিদা ও অর্থনীতিতে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং নিষিদ্ধ জাল জব্দ করে পুড়িয়ে ফেলার মতো উদ্যোগ নেওয়া হলেও, তা এই বিশাল চলনবিল অঞ্চলের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। হাট-বাজারগুলোতে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে এই নিষিদ্ধ জাল, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কেবল সাময়িক অভিযান চালিয়ে এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

পরিবেশবাদী লেখক প্রভাষক সনাতন দাশ বলেন, চলনবিলের এই অমূল্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে এখনই প্রয়োজন সমন্বিত এবং কঠোর পদক্ষেপ। প্রথমত, রিংজাল ও চায়নাদুয়ারির মতো ক্ষতিকর জালের উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং আইন অমান্যকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

পাশাপাশি, বিল পাড়ের সাধারণ জেলে ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। তাদের বোঝাতে হবে যে, আজকের এই ক্ষণস্থায়ী অতি-মুনাফা আগামী দিনে তাদের নিজেদেরই জীবিকাহীন করে তুলবে।

সরকারের মৎস্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় যদি প্রজনন মৌসুমে চলনবিলে মাছের অভয়াশ্রম তৈরি করা এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা যায়, তবেই হয়তো ফিরে আসবে চলনবিলের সেই চেনা রূপালী ঐশ্বর্য। আমাদের উদাসীনতায় যেন চিরতরে হারিয়ে না যায় দেশীয় মাছের এই স্বর্গরাজ্য।

তাড়াশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন জানান, নিষিদ্ধ রিংজাল ও চায়নাদুয়ারি জাল দেশের মৎস্য সম্পদের জন্য এক বড় অভিশাপ। তিনি আরো বলেন, নতুন পানি আসার পর থেকেই চলনবিলে দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশবৃদ্ধির মোক্ষম সময়। এই সময়ে একশ্রেণির অসাধু জেলে আইন অমান্য করে রিংজাল ব্যবহার করছেন।

আমরা ইতোমধ্যেই মাঠ পর্যায়ে তদারকি শুরু করেছি। মৎস্যসম্পদ রক্ষায় আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, চলনবিলের মৎস্য ঐতিহ্য রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।

নিষিদ্ধ রিংজাল দিয়ে মা ও পোনা মাছ ধ্বংস করা দণ্ডনীয় অপরাধ। খুব দ্রুতই চলনবিলের বিভিন্ন পয়েন্টে এবং হাট-বাজারগুলোয় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করব।

যারা এই অবৈধ জাল তৈরি, বিক্রি বা মাছ শিকারে ব্যবহার করছেন, তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়