ঝুঁকি এড়াতে ডিজিটাল বিপ্লব
সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ইউরোপে যাচ্ছেন আনসারের নারী সদস্যরা

ইউরোপের বুকে একটি সুন্দর কর্মসংস্থানের সোনালী স্বপ্নের পেছনে রয়েছে কিছু অন্ধকার বাস্তবতা। প্রতিনিয়ত শত শত যুবক জমি-জমা বেচে দালালের খপ্পরে পড়ছেন, আবার কেউ কেউ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। চিরচেনা এই ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রতারণার বৃত্ত ভেঙে এবার সম্পূর্ণ নিরাপদ, আইনি এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ইউরোপের দেশ মলদোভায় দক্ষ কর্মী পাঠানোর এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। বাহিনীর ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে ঢাকা মহানগর আনসার (ডিএমএ) এর ৩০০ জন শহর প্রতিরক্ষা দল (টিডিপি) নারী সদস্যার ভাগ্য বদলের এই আধুনিক বাছাই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
তদবির ও কারচুপির সুযোগ শূন্য: এই মহতী উদ্যোগের পেছনে রয়েছে বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা। দালালের দৌরাত্ম্য রুখতে এবং শতভাগ মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে গঠন করা হয়েছে ৫টি শক্তিশালী বাছাই কমিটি। নূন্যতম অনিয়মের সুযোগ বন্ধ করতে এই কমিটিগুলো সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার সাথে প্রতিটি ধাপ তদারকি করছে।
গত ৮ জুলাই (বুধবার) বাছাই কার্যক্রমের প্রথম ধাপে ঢাকা মহানগর আনসার উত্তর ও পূর্ব জোনের প্রাথমিক বাছাইয়ে যোগ্য ১৩৯ জন টিডিপি নারী সদস্যা অংশ নেন। বিদেশ গমনেচ্ছুক প্রার্থীরা প্রথমে নির্ধারিত 'স্বঘোষণা' (Self-Declaration) ফর্মে স্বাক্ষর করেন।
প্রথাগত কাগজ-কলমের পরীক্ষার বদলে এখানে গুরুত্ব পেয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। পরীক্ষা কক্ষে দায়িত্বরত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের কড়া নজরদারিতে প্রার্থীরা নিজ নিজ স্মার্টফোনের জিমেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সরাসরি 'গুগল ফর্ম'-এর মাধ্যমে লাইভ লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। এছাড়া প্রার্থীদের নিখুঁতভাবে ওজন ও উচ্চতা পরিমাপসহ যাবতীয় শারীরিক যোগ্যতা যাচাই শেষে তারা ৫টি কমিটির জুরি বোর্ডের সামনে সরাসরি সাক্ষাৎকারে অংশ নেন।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, প্রার্থীদের প্রতিটি ধাপের পরীক্ষার মূল্যায়নের তথ্য একটি বিশেষায়িত সফটওয়্যারে ইনপুট করা হচ্ছে। ফলে কোনো রকম মানুষের হস্তক্ষেপ বা কারচুপি ছাড়াই সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেধা তালিকা প্রস্তুত করছে। এই ধারাবাহিকতায় আজ ৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) দ্বিতীয় ধাপে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও পশ্চিম জোনের আরও ১৬১ জন নারী সদস্যা একই ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি: কেবল যোগ্য কর্মী বাছাই করাই এই উদ্যোগের শেষ কথা নয়; এর মান নিয়ন্ত্রণে আপসহীন অবস্থান নিয়েছে বাহিনী। মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। নির্বাচিত প্রার্থীদের ইউরোপের সমাজ, সংস্কৃতি ও কাজের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষ মডিউল। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের কঠিন চ্যালেঞ্জ জয়ে প্রার্থীদের পেশাদার দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি তাদের মাঝে দৃঢ় মানসিকতা গড়ে তুলতে দেওয়া হবে উন্নত ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ।
রেমিট্যান্স ও নারী ক্ষমতায়নে নতুন দিগন্ত: ইউরোপে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখা এদেশের লাখো তরুণীর জন্য এই উদ্যোগ এখন এক নতুন সম্ভাবনা ও আশার আলো। প্রথাগত ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের চিরচেনা অন্ধকার পথ মাড়িয়ে এই নারীরা যখন বৈধ উপায়ে ইউরোপের মাটিতে পা রাখবেন, তখন তা দেশের অন্য নারীদের মাঝেও ডানা মেলার সাহস জোগাবে।
দালালমুক্ত এবং সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে ইউরোপ যাওয়ার এই যুগান্তকারী মডেলটি সফল হলে তা দেশের সামগ্রিক জনশক্তি রপ্তানি খাতের জন্য একটি অনুকরণীয় ও বৈপ্লবিক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে। প্রশিক্ষণ শেষে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন শুধু একজন সাধারণ নারীর ভাগ্যবদল বা পারিবারিক সচ্ছলতাই আনবে না, বরং তাদের প্রেরিত রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে যোগ করবে নতুন গতি। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে উজ্জ্বল হবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি।
পিডিএস/এমএইউ









































