মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

  ১ ঘণ্টা আগে

কুলাউড়ায় বোরো চাষিদের প্রণোদনা বিতরণে অনিয়ম, তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বোরো চাষিদের মাঝে সরকারি প্রণোদনা বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় প্রকৃত ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে অকৃষক ও প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের স্বজনদের নাম অন্তর্ভুক্ত করায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে।

এমন পরিস্থিতিতে কুলাউড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। গত বৃহস্পতিবার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এম. এস. জামান মতিনকে আহ্বায়ক করে ৩ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন—উপজেলা বিএনপির সদ্য সাবেক আহ্বায়ক রেদোয়ান খান ও সদস্য মঈনুল হক বকুল। কমিটিকে আগামী ৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বজনপ্রীতি ও অকৃষকদের নাম অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ

স্থানীয় কৃষক ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাজীপুর, ব্রাহ্মণবাজার, টিলাগাঁও ও ভাটেরাসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের চূড়ান্ত তালিকা থেকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বাদ পড়েছেন। উল্টো যারা কোনোদিন বোরো চাষ করেননি, তাদের নাম তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, হাজীপুর ইউনিয়নের তালিকা বাছাই কমিটিতে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান ও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা নূর আহমেদ চৌধুরী বুলবুল এবং তাঁর বোনজামাই ও সাবেক বিএনপি নেতা ফারুক আহমেদ পান্না। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর দেখা যায়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দুই ভাই তোফায়েল আহমেদ ও শাহীন আহমেদ এবং ফারুক আহমেদ পান্নার ভাই ছালেহ আহমেদের নাম সেই তালিকায় স্থান পেয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রকাশের পর ব্রাহ্মণবাজার ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নের কৃষকরা তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানান। নেটিজেনদের একাংশ মন্তব্য করেছেন, তালিকায় এমন কিছু ব্যক্তির নাম আছে যাদের এক শতক বোরো জমিও নেই। জয়চণ্ডী ইউনিয়নের ক্লিভডন চা বাগান এলাকায় কোনো বন্যাই হয়নি, অথচ সেখানকার ১৫ জন অকৃষক ওই তালিকায় সুবিধাভোগী হিসেবে স্থান পেয়েছেন। জয়চণ্ডী ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সাধারণ সম্পাদক আব্দুস শহীদ রানা ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে লিখেছেন, "যাদের পায়ে কোনোদিন কাদা লাগেনি, তালিকায় তারাও এখন কৃষক।"

প্রণোদনা প্রকল্প ও তালিকা জট

সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাম্প্রতিক প্রবল বর্ষণে হাওরাঞ্চলে আকস্মিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মানবিক সহায়তা হিসেবে পরিবার প্রতি ১৫ কেজি চাল ও নগদ ৩ হাজার টাকা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের তথ্যমতে, পুরো উপজেলায় চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১,৫৩৭টি।

এর মধ্যে ভূকশিমইলে ৪৩৭টি, কাদিপুরে ১৯৫টি, ব্রাহ্মণবাজারে ১৯০টি, ভাটেরায় ১৫০টি, বরমচালে ১৪৫টি, পৌরসভায় ১০০টি, জয়চণ্ডীতে ৯০টি, রাউৎগাঁওয়ে ৬০টি, হাজীপুরে ৬৫টি, কুলাউড়া সদরে ৪০টি, টিলাগাঁওয়ে ৩৫টি এবং পৃথিমপাশা ইউনিয়নে ৩০টি পরিবার রয়েছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে মাঠপর্যায়ের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মনোনীত প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি-সম্পাদক এবং ইউপি চেয়ারম্যানদের সমন্বয়ে আরেকটি তালিকা করতে গিয়ে ব্যাপক যোজন-বিয়োজন করা হয়। খোদ ইউনিয়ন বিএনপির কয়েকজন নেতাই অভিযোগ করেছেন, এই পুনর্বিন্যাসের কারণেই মূলত প্রকৃত কৃষকরা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।

গত ২৫ জুন সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে লেখেন, "ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা বিতরণে অনেক অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না।" এর পরিপ্রক্ষিতেই তিনি এই দলীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

এ বিষয়ে কুলাউড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রাজু চন্দ্র পাল বলেন, "ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে যারা বাদ পড়েছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শক্রমে তাঁদের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর পরবর্তী চাহিদাপত্র প্রেরণ করা হয়েছে।"

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা আক্তার এক ক্ষুদে বার্তায় জানান, "অভিযোগের বিষয়টি আমলে নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে তদন্তপূর্বক দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।"

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়