গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ
সমৃদ্ধির দুয়ার খুলে দিতে পারে চলনবিলের কৃষি ও মৎস্যসম্পদ

শত বছরের বিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী শস্য ও মৎস্যভাণ্ডার খ্যাত চলনবিল আজ নাব্যতা হারিয়ে মরা খালে পরিণত হতে চলেছে। কালের আবর্তে বিলটি হারিয়ে ফেলেছে তার চিরচেনা রূপ, যৌবন আর ঐতিহ্য। এখন বর্ষা মৌসুমে চলনবিলে থই থই পানি চোখে পড়লেও শুষ্ক মৌসুমের আগেই বিল, নদী ও খাড়ি শুকিয়ে জেগে উঠছে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। তবে আশার কথা হলো, নানামুখী সংকটের মধ্যেও চলনবিলে উৎপাদিত কৃষি পণ্য ও মৎস্যসম্পদ এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করেছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে সমৃদ্ধির অপার দুয়ার খুলে দিতে পারে।
সংকুচিত চলনবিল ও বর্তমান প্রেক্ষাপট: ইতিহাস থেকে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, নওগাঁ ও বগুড়া জেলার একাংশ জুড়ে ছিল চলনবিলের আদি অবস্থান। ১৯১৪ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপনের পর থেকে মূলত এর উত্তর ও পশ্চিম অংশকে চলনবিল হিসেবে অভিহিত করা হয়। এম এ হামিদ টি কে ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘চলনবিলের ইতিকথা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ১৮২৭ সালে জনবসতি বাদে চলনবিলের জলময় অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলেরও বেশি। তবে ১৯০৯ সালের চলনবিল জরিপ কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, বিলের আয়তন কমে দাঁড়ায় ১৪২ বর্গমাইল, যার মধ্যে মাত্র ৩৩ বর্গমাইল এলাকায় সারা বছর পানি থাকত। বর্তমানে অপরিকল্পিতভাবে খাল খনন ও পানি নিষ্কাশনের ফলে শুষ্ক মৌসুমে বিলে আর পানি চোখে পড়ে না।
কৃষিতে নীরব বিপ্লব ও রপ্তানির সম্ভাবনা: কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে বিলের পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথেই জেগে ওঠে উর্বর সমতল ভূমি। পৌষ-মাঘ মাসের মধ্যেই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করে বোরো ধানের চারা রোপণ শেষ হয় এবং বৈশাখ থেকে শুরু হয় ধান কাটা। শুধু ধানই নয়; সরিষা, পাট, রসুন, পেঁয়াজ, তরমুজ, বাঙ্গি, মরিচ, গাজর, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, আলু, পটল ও লাউসহ নানা প্রকার রবি ফসল ও শাকসবজি চাষ হচ্ছে এখানে।
এ অঞ্চলের উৎপাদিত সবজি এখন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পাবনা, রাজশাহী ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। সবজির পাইকাররা প্রতিদিন অমৃতকুণ্ডা হাট, মির্জাপুর হাট, ছাইকোলা হাট ও মহিশলুটি হাটসহ চলনবিল অঞ্চলের ১২টি প্রধান হাটবাজার থেকে সবজি সংগ্রহ করছেন। এমনকি ঢাকা থেকে আকাশপথে এসব টাটকা সবজি আমেরিকা, ইংল্যান্ড, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ইরাকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।
মৎস্যসম্পদ ও বিকল্প চাষে নতুন দিগন্ত: এক সময় চলনবিলের সুস্বাদু দেশীয় মাছের চাহিদা ছিল দেশজুড়ে, এমনকি তা কলকাতার বাজারেও রপ্তানি হতো। প্রাকৃতিকভাবে মাছের উৎপাদন কমলেও বর্তমানে বিলে অসংখ্য পুকুর কেটে বিদেশি হাইব্রিড মাছের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে কুচিয়া ও কাঁকড়া চাষ করা হচ্ছে, যা চীনে রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়া গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালন, বাণিজ্যিক মৌচাষ ও শামুক-চিংড়ি চাষের মাধ্যমে চাষিরা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা চাঙ্গা করে তুলছেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য দপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক দেবাশীষ ঘোষ জানান, বর্তমানে চলনবিলে ৬,২৭৫ জন তালিকাভুক্ত জেলে রয়েছেন, যার বাইরে বর্ষাকালে আরও বহু মানুষ মাছ ধরায় যুক্ত হন। ১২,২৮৪.৭৫ হেক্টরের এই চলনবিলে বাৎসরিক মাছের উৎপাদন প্রায় ৫,২৩০.৭৩ মেট্রিক টন।
সংকট ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: চলনবিলের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চাষিরা প্রতি বছর উৎপাদিত পণ্যের সঠিক সংরক্ষণাগার ও উপযুক্ত বিপণন ব্যবস্থার অভাবে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া বর্ষার পর বছরের প্রায় পাঁচ মাস এ অঞ্চলের একটি বড় জনগোষ্ঠী বেকার জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ)-এর কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিরাজগঞ্জ শাখার আহ্বায়ক দীপক কুমার কর বলেন, "চলনবিল রক্ষায় অবিলম্বে বিলের ৪৮টির বেশি নদী ও পাঁচশতাধিক খাল দখলমুক্ত করে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করতে হবে। বড়াল নদীর চারঘাট স্লুইসগেটসহ সকল অপরিকল্পিত অবকাঠামো অপসারণ করে দখল ও দূষণকারীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।" তিনি স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে এম মঞ্জুরে মওলা জানান, চলনবিলের মধু ও সরিষা দেশের ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণে বড় ভূমিকা রাখছে। সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে বোরো মৌসুমে চলনবিল থেকে রেকর্ড পরিমাণ ধান উৎপাদন সম্ভব, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিস্তীর্ণ চলনবিল অঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে—এমনটাই প্রত্যাশা বিশেষজ্ঞদের।
পিডিএস/এমএইউ









































