মো. ইফতেখার উদ্দিন, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
নিকার সভায় উঠছে প্রস্তাব
ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা গঠন চূড়ান্ত পর্যায়ে, সুয়াবিলবাসীর অসন্তোষ

চট্টগ্রামের বৃহত্তম উপজেলা ফটিকছড়িকে বিভক্ত করে দুটি আলাদা উপজেলা করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। পূর্ববর্তী সরকারগুলোর খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যমান ফটিকছড়ি উপজেলার পাশাপাশি ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ নামে নতুন আরেকটি প্রশাসনিক ইউনিট গঠিত হতে যাচ্ছে। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, উত্তরের ৪টি ইউনিয়ন এবং দক্ষিণে থাকা হারুয়ালছড়ি ও সুয়াবিল—এই দুটি ইউনিয়ন নিয়ে নতুন উপজেলাটি গঠিত হবে।
বুধবার (১ জুলাই) প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় এই প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত হবে বলে গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে।
সুয়াবিলবাসীর স্বপ্নভঙ্গ ও ক্ষোভ : নতুন উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে চললেও এর সীমানা নির্ধারণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র অসন্তোষ ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ‘বৃহত্তর সুয়াবিল অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ সুয়াবিল ইউনিয়নকে নতুন উপজেলার প্রস্তাবনা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেছে। সুয়াবিলবাসীর দাবি, মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে বর্তমান ফটিকছড়ি উপজেলা সদর, হাসপাতাল ও দুটি পৌরসভা বিদ্যমান থাকতে তারা অনর্থক দূরবর্তী ভূজপুর বা উত্তর ফটিকছড়ির অধীনে যাবে কেন? তারা বর্তমান মূল ফটিকছড়ি উপজেলার সঙ্গেই থাকতে চান এবং ভূজপুর থানা থেকে সুয়াবিলকে বাদ দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে সাবেক ইউএনও সাব্বির রহমান সানি ও স্থানীয় চেয়ারম্যানদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে সুয়াবিলকে বাদ দিয়ে ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে ‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’ গঠনের সিদ্ধান্ত ও জেলা প্রশাসক বরাবর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তৎকালীন ইউএনও মোজাম্মেল হক পূর্বের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সুয়াবিল ইউনিয়নকে যুক্ত করায় এই জটিলতার সৃষ্টি হয়, যাকে স্থানীয়রা ‘নানা পক্ষের ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করছেন।
উত্তর ফটিকছড়িবাদীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা : বর্তমানে ফটিকছড়ি উপজেলায় দুটি থানা (ফটিকছড়ি ও ভূজপুর) থাকলেও দুটি পৌরসভা ও দুটি হাসপাতালই দক্ষিণ ফটিকছড়িতে (ফটিকছড়ি সদর ও নাজিরহাট) অবস্থিত। ফলে উত্তরের বাগানবাজার, দাঁতমারা, নারায়াণহাট ও ভূজপুর—এই ৪টি ইউনিয়নের প্রায় ৪ লাখ জনগোষ্ঠী নাগরিক ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।
স্বাধীনতার পর থেকে এই ৪টি ইউনিয়নে বাজেট বরাদ্দের খুব কম অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে তারা যুগ যুগ ধরে মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। যেমন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নাজিরহাটে অবস্থিত, যা পার্শ্ববর্তী হাটহাজারী উপজেলার খুব কাছে হওয়ায় উত্তরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এর সুফল পায় না। এছাড়া, নব্বইয়ের দশকের আগে এ অঞ্চলে কোনো উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান ছিল না। বর্তমানে কিছু বেসরকারি স্কুল-কলেজ থাকলেও কোনো সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় বা কলেজ নেই। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখানে শিক্ষার হারও তুলনামূলক কম।
যোগাযোগের সুবিধার্থে নতুন উপজেলা সদরটি নারায়ণহাট ইউনিয়নের উত্তরে করার দাবি জানিয়ে স্থানীয়রা আশা করছেন, নতুন উপজেলা হলে তাদের দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনার অবসান ঘটবে। এছাড়া ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বর্তমানে বনভূমি দখল, হালদা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাহাড় কাটা বন্ধে উপজেলা প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে না। নতুন উপজেলা হলে হেঁয়াকো সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানো সহজ হবে।
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সায়েদ ইব্রাহিম গণমাধ্যমকে জানান, নতুন উপজেলা অনুমোদনের বিষয়টি সাধারণত নিকার সভায় চূড়ান্ত হয়। ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা গঠনের ফাইলটি বর্তমানে নিকার সভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষ হলে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে।
পিডিএস/এমএইউ








































