আনিকা বিনতে আজিজ

  ২৫ জুন, ২০২৬

মুক্তমত

নম্বরের দৌড়ে হারিয়ে যাচ্ছে জীবন

প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগের রাতটি হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য হয়ে ওঠে উৎকণ্ঠার রাত। অনেকের চোখে ঘুম থাকে না, কেউ নিজেকে গুটিয়ে নেয়, কেউ আবার ভয়াবহ সিদ্ধান্তের দিকেও এগিয়ে যায়। ভয় একটাই- রেজাল্ট খারাপ হলে মা-বাবা কী বলবেন, সমাজ কী বলবে? যখন এই ভয় অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন কেউ কেউ বেছে নেয় চিরবিদায়ের পথ। শিক্ষার্থীদের

আত্মহত্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি সমাজের নীরব এক সংকটে পরিণত হয়েছে।

আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থী ১৯০ জন, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৪৭.৪ শতাংশ। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩১০ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৭৭ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।

জরিপ বলছে, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে অন্যতম কারণ বিষণ্ণতা, অভিমান ও মানসিক আঘাত। এ ছাড়া প্রেমঘটিত জটিলতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মানসিক

অস্থিরতা ও যৌন নিপীড়নের মতো কারণও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে শিক্ষাজীবনের চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক তরুণ-তরুণীকে হতাশার দিকে ঠেলে দেয়।

অনেক সময় সমস্যার শুরু পরিবার থেকেই। জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক সামাজিক প্রতিযোগিতা সন্তানের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করে। অনেক অভিভাবক সন্তানের ফলাফলকে নিজের সম্মান ও সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখতে শুরু করেন। অথচ কৈশোর এমন একটি সময়, যখন সন্তান সবচেয়ে বেশি চায় পরিবারের বোঝাপড়া, সহমর্মিতা ও নিঃশর্ত ভালোবাসা।

যখন সন্তানকে শোনার প্রয়োজন হয়, তখন তাকে শাসন করা হয়; যখন পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হয়, তখন তাকে তুলনা করা হয় অন্যের সঙ্গে। এই ভুল আচরণ সন্তানকে ধীরে ধীরে একাকিত্ব ও হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। পরিবারে ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতার অভাব হলে অনেক শিক্ষার্থী বাইরের ভুল প্রভাব, নেশা কিংবা ক্ষতিকর সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের প্রথম দায়িত্ব পরিবারকেই নিতে হবে। পরিবার হওয়া উচিত ভালোবাসা ও নিরাপত্তার প্রথম আশ্রয়। সন্তানের রেজাল্ট নয়, তার মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি খারাপ ফলাফল জীবনের সমাপ্তি নয়; কিন্তু একজন সন্তানকে হারানো একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

সন্তানের বন্ধু হোন। ফলাফলের দিন তাকে আশ্বস্ত করুন- ‘তুমি চেষ্টা করেছ, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ অন্যের সঙ্গে তুলনা নয়, বরং তার ব্যক্তিগত সক্ষমতা ও প্রচেষ্টাকে মূল্যায়ন করুন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং কর্নার স্থাপন, নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে সাইবার বুলিং, সামাজিক অপমান ও বেকারত্বজনিত হতাশা কমাতে সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ

প্রয়োজন।

আঁচল ফাউন্ডেশনের মতে, এসব সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; এগুলো আমাদের পরিবার, সমাজ ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু মানে শুধু একটি প্রাণের অবসান নয়- এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন এবং একটি দেশের সম্ভাবনার অপচয়।

মনে রাখতে হবে, সন্তান কোনো প্রতিযোগিতার ঘোড়া নয়; সে একজন স্বতন্ত্র মানুষ, একটি মূল্যবান আমানত। তাই রেজাল্ট খারাপ হলে বকুনি নয়, তার পাশে দাঁড়ান, তাকে জড়িয়ে ধরুন। কারণ যে সন্তান অভিমানে নিজের দরজা বন্ধ করে দেয়, সে হয়তো সাহায্যের জন্য নীরবে অপেক্ষা করছে।

আসুন, নম্বরের পেছনে নয়- মানুষ গড়ার পথে এগিয়ে যাই। ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করি। কারণ একটি জীবন বাঁচানো মানে একটি সম্ভাবনাময় পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখা।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়