মো. রেজাউল করিম রনি
দৃষ্টিপাত
নিম্ন-মধ্যবিত্তের জীবনযুদ্ধ : আয় বাড়ে না, ব্যয় থামে না

বাংলাদেশের অর্থনীতির নানা সূচক নিয়ে আমরা প্রায়ই আশাবাদের কথা শুনি। কখনো প্রবৃদ্ধির হার, কখনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কখনো রপ্তানি আয়ের নতুন রেকর্ড এসব অর্জন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য শুধু পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চলে না দেখতে হয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান, তাদের ক্রয়ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের আস্থা কতটুকু। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে, সঞ্চয় কমে গেছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে এবং জীবনযুদ্ধ প্রতিদিন আরো কঠিন হয়ে উঠছে।
একসময় মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বলা হতো সমাজের মেরুদণ্ড। কারণ এই শ্রেণির মানুষই শিক্ষা, প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে। তাদের স্বপ্ন ছিল সীমিত আয়ের মধ্যেও সৎভাবে জীবনযাপন করা, সন্তানদের ভালো শিক্ষা দেওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় গড়ে তোলা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিক চাপ সেই স্বপ্নকে ক্রমশ সংকুচিত করে ফেলেছে।
বর্তমান বাস্তবতায় একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো মাসের হিসাব মেলানো। মাসের শুরুতে বেতন হাতে আসে, কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই অর্থের বড় অংশ চলে যায় বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি এবং অন্যান্য নিয়মিত খরচে। এরপর বাজার খরচ, সন্তানের শিক্ষা, যাতায়াত এবং চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত নতুন হিসাব করতে হয়। মাসের শেষ সপ্তাহে এসে অনেক পরিবারকে ধার-দেনা, বাকিতে কেনাকাটা কিংবা সঞ্চয় ভেঙে চলতে হয়। এ এক এমন বাস্তবতা, যা পরিসংখ্যানের খাতায় ধরা পড়ে না, কিন্তু লাখো পরিবারের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মূল্যস্ফীতি বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয়। মূল্যস্ফীতি মানে শুধু দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নয় এর অর্থ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। যখন একজন মানুষের আয় একই থাকে কিন্তু বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তখন প্রকৃত অর্থে তার আয় কমে যায়। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, তা নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে।
চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, সবজি, মাছ, মাংস এবং ডিম প্রতিটি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। একসময় যে পরিবার সপ্তাহে কয়েক দিন মাছ-মাংস খেতে পারত, আজ তারা সেই খরচ কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছে। পুষ্টিকর খাবার ধীরে ধীরে অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর ফলে শুধু অর্থনৈতিক নয়, জনস্বাস্থ্যগত সমস্যাও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বাসাভাড়াও। শহরাঞ্চলে বসবাসকারী নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এটি এখন সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাতগুলোর একটি। অনেক পরিবারকে আয়ের এক-তৃতীয়াংশ, কখনো কখনো অর্ধেক পর্যন্ত বাসাভাড়ার পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয় বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও ইন্টারনেট বিল। ফলে মাসের শুরুতেই আয়ের একটি বড় অংশ খরচ হয়ে যায়। অনেকেই বাধ্য হয়ে ছোট বাসায় চলে যাচ্ছেন অথবা শহরের কেন্দ্র থেকে দূরে বসবাস শুরু করছেন। কিন্তু এতে যাতায়াত ব্যয় ও সময় দুটোই বেড়ে যাচ্ছে।
শিক্ষা খাতেও ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে সন্তানের শিক্ষা শুধু একটি ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। কিন্তু বর্তমানে স্কুল-কলেজের ফি, বইপত্র, কোচিং, যাতায়াত এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার নানা খরচ অনেক পরিবারের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। বহু অভিভাবক নিজেদের ব্যক্তিগত চাহিদা কমিয়ে সন্তানের শিক্ষার ব্যয় বহন করছেন। কেউ নতুন পোশাক কেনা বন্ধ করেছেন, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়েছেন, কেউ আবার সঞ্চয়ের টাকা খরচ করছেন। কারণ তারা বিশ্বাস করেন, শিক্ষা ছাড়া ভবিষ্যৎ উন্নতির অন্য কোনো বিকল্প নেই।
চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টি আরো উদ্বেগজনক। দেশে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একটি বড় অসুস্থতা অনেক পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে করে দিতে পারে। চিকিৎসকের ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এবং হাসপাতালে ভর্তি সব মিলিয়ে ব্যয় বহন করা সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি করেন বা অসম্পূর্ণ চিকিৎসার আশ্রয় নেন। এতে রোগ জটিল হয় এবং শেষ পর্যন্ত ব্যয় আরো বেড়ে যায়।
নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো তাদের সংকট অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও নিম্ন-মধ্যবিত্তরা প্রায়ই সেই সুবিধার বাইরে থেকে যায়। আবার আত্মসম্মান ও সামাজিক মর্যাদার কারণে তারা প্রকাশ্যে সহায়তা চাইতেও সংকোচ বোধ করেন। ফলে তারা এক ধরনের নীরব দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করেন। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তাদের জীবন চলে অভাব, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে।
এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সঞ্চয়ের সংকট। একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রধান নিরাপত্তা ছিল তাদের সঞ্চয়। চাকরি হারানো, অসুস্থতা বা জরুরি পরিস্থিতিতে সেই সঞ্চয়ই ছিল ভরসা। কিন্তু দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি এবং বাড়তি ব্যয়ের চাপে অনেক পরিবার এরই মধ্যে তাদের সঞ্চয় ভেঙে ফেলেছে। কেউ ব্যাংকের আমানত তুলেছেন, কেউ সঞ্চয়পত্র নগদায়ন করেছেন, কেউ স্বর্ণালংকার বিক্রি করেছেন। অর্থাৎ ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে তারা বর্তমানে টিকে থাকার সংগ্রামে সেই সঞ্চয় ব্যয় করছেন।
অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব শুধু আর্থিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয় এটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। সংসারের ব্যয় মেটাতে না পারার উদ্বেগ, ঋণের চাপ, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং সামাজিক প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার হতাশা অনেক মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। পরিবারে অশান্তি বাড়ছে, সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে এবং মানুষের মধ্যে হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন তা সমাজের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ অবস্থায় রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুদদারি এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং বাজার তদারকি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। কারণ শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না মানুষের আয়ও বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারি সেবার মান উন্নত করাও জরুরি। যদি মানুষ কম খরচে মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসা পায়, তাহলে তাদের ওপর আর্থিক চাপ অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
তবে রাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়েও সচেতনতা প্রয়োজন। পরিকল্পিত বাজেট, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, সঞ্চয়ের অভ্যাস বজায় রাখা এবং নতুন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করা বর্তমান সময়ের বাস্তব চাহিদা। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা কিংবা খণ্ডকালীন কাজ অনেকের জন্য সহায়ক হতে পারে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতেই হবে, এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতার ফল নয়। এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ। তাই এর সমাধানও সামষ্টিক পর্যায়ে খুঁজতে হবে। কারণ একটি দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি দুর্বল হয়ে পড়লে অর্থনীতির ভিতও দুর্বল হয়ে পড়ে। ভোগব্যয় কমে যায়, সঞ্চয় হ্রাস পায় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি মন্থর হয়ে যায়।
বাংলাদেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ আজ কোনো বিলাসিতা চায় না। তারা শুধু চায় পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য, স্থিতিশীল বাজার, সন্তানের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ। তারা চায় মাস শেষে কিছু অর্থ সঞ্চয় করতে, চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে আতঙ্কিত না হতে এবং প্রতিদিনের বাজার করতে গিয়ে নতুন করে উদ্বিগ্ন না হতে।
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়। বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি তাই নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ তাদের হাসি, স্বস্তি এবং নিরাপত্তার মধ্যেই একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে।
আজ সময় এসেছে এই নীরব জীবনযুদ্ধকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার। কারণ নিম্ন-মধ্যবিত্তের দীর্ঘশ্বাস শুধু একটি শ্রেণির কষ্ট নয় এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। তাদের জীবনযুদ্ধ সহজ করতে না পারলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই উজ্জ্বল হোক না কেন, সেই উন্নয়ন পূর্ণতা পাবে না।
লেখক : সাবেক শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট
"





































