মোহাম্মদ ইয়াছিন
মুক্তমত
ডিজিটাল বন্দিত্বে কমছে শিক্ষার মান

থাকব না ক বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের তরুণ প্রজন্মকে উৎসর্গ করে লেখা এই পঙক্তি অনুসারে তরুণদের অজানাকে জানার জন্য, জগতের রহস্য উন্মোচনের জন্য ছুটে চলার কথা। ছুটে চলার কথা প্রকৃতির কাছে, আবিষ্কারের সন্ধানে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে দেখা যায় তার উল্টো চিত্র। নিজের কৌতূহল, আগ্রহ ও তৃষ্ণার জন্য জ্ঞানের পেছনে ছোটার বদলে তারা বেছে নিয়েছে ডিজিটাল বন্দিত্ব। তাদের জীবন এখন বন্দি বদ্ধ ঘরে, চোখ বন্দি ফোন অথবা কম্পিউটার পর্দায় ও মস্তিষ্ক বন্দি ডিজিটাল অ্যালগরিদমে।
একবিংশ শতাব্দীর এই যুগে প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনের কথা চিন্তা করা অসম্ভব ব্যাপার। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, টেলিভিশন ইত্যাদি ডিজিটাল ডিভাইস সমূহ বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সব আধুনিক ডিভাইসগুলো আমাদের শিক্ষা, ক্যারিয়ার, ব্যবসা ও দৈনন্দিন কাজকর্মকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। ডিজিটাল বন্দিত্ব বলতে বোঝায় বড় বড় গ্লোবাল টেক জায়ান্ট- ফেসবুক, গুগল, অ্যামাজনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়াকে, যার ফলে আমাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা ও চিন্তা করার ক্ষমতা কিছু নির্দিষ্ট কোম্পানির হাতে চলে যায়। কিন্তু প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সেইসঙ্গে ধ্বংস করছে আমাদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও জানার আগ্রহকে, যা আমাদেরকে ধাবিত করছে ডিজিটাল বন্দিত্বের দিকে।
ডিজিটাল বন্দিত্ব শিক্ষাক্ষেত্রে গভীর প্রভাব বিস্তার করছে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তি একটি আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু বর্তমানে ক্লাস, প্রেজেন্টেশন, অ্যাসাইনমেন্টসহ পুরো পড়াশোনার প্রক্রিয়া অত্যধিক প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় শিক্ষাক্ষেত্রে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব ও পরোক্ষ দাসত্ব তৈরি হচ্ছে। গুগল ক্লাসরুম, মুডল, স্কুলজি, জুম, গুগল মিট ও নানা বৈদেশিক প্ল্যাটফর্ম সমূহ বর্তমানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আমাদের সম্পূর্ণভাবে সেই সকল প্ল্যাটফর্মের উপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। ফলে কোনো কারণে উক্ত প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়বে। এ ছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তথ্য সংগ্রহের জন্য যেসকল সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করছে তা তাদের ব্যক্তিগত তথ্য, মেধা ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনা সংরক্ষণ করছে এবং তাদের চিন্তাধারাকে একটি নির্দিষ্ট অ্যালগরিদমে বেঁধে উপস্থাপন করছে। ইন্টারনেটে তথ্যের সঠিক কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় খুব সহজেই প্লেজিয়ারিজমের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে- ফলে একজনের গবেষণা খুব সহজেই অন্যজন নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছে, যা প্রকৃত গবেষকদের গবেষণার প্রতি উৎসাহ ও আগ্রহকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্লেজিয়ারিজম হলো অন্য কোনো ব্যক্তির লেখা, ধারণা, গবেষণা, ছবি ও সৃজনশীলতাকে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ক্লড, পার্পলেক্সিটি ইত্যাদি এআই টুলগুলোর অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতাকে হ্রাস করছে, যা এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বন্দিত্ব তৈরি করছে।
এ ছাড়া পড়াশোনার সময় অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন ও মেসেজ শিক্ষার্থীর মনোযোগ নষ্ট করছে, যাকে অ্যাটেনশন ক্যাপটিভিটি বা মনোযোগের বন্দিত্ব বলে। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার শর্ট ভিডিওর প্রতি আসক্তি শিক্ষার্থীর মধ্যে ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন বা তাৎক্ষণিক পরিতৃপ্তি সৃষ্টি করছে, ফলে তাদের মাঝে তৈরি হচ্ছে মনোযোগের অভাব ও ধৈর্যহীনতা। ইউনেস্কোর বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ী শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই শিক্ষার লক্ষ্য ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী হতে হবে। অতিরিক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও শেখার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়াও ইউনিসেফের “The State of the WorldÕs Children” রিপোর্ট অনুযায়ী ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম জীবন, সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক-কমেন্টের মোহ এবং বাস্তব যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্নতা কিশোর-কিশোরীদের তীব্র একাকীত্ব, হীনমন্যতা- FOMO (Fear of Missing Out)- এবং বিষণ্ণতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
একইসঙ্গে প্রযুক্তির প্রতি আসক্তির কারণে শারীরিক অসুস্থতা যেমন ঘাড় ব্যথা, কোমরে ব্যথা, মাইগ্রেন, মেয়েদের পিসিওএস, ঘুমে অসুবিধা, ত্বকের ডিহাইড্রেশন, চোখে ত্রুটি তৈরিসহ নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী পড়াশোনার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে, প্রতিদিনের পড়া তৈরি করতে পারে না, পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হয়। এ ছাড়াও অনেক অদক্ষ শিক্ষক সরাসরি যেকোনো সমস্যার সমাধান এআই দিয়ে করে থাকেন, ফলে প্রযুক্তির ভুলও তারা ধরতে পারেন না। একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণ সমাজের ওপর নির্ভরশীল। ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার তরুণদের শেখার ক্ষমতা ও সৃজনশীলতাকে প্রায় ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা একটি জাতির ভবিষ্যৎকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাই আমাদের সবাইকে এই বিষয়ে এখনই বিশেষভাবে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক সতর্কতাই আমাদের এই বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করতে পারে। প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে সন্তানরা কী দেখছে তা নজরদারির মাধ্যমে তাদের ক্ষতিকর সাইট ও গেমিং অ্যাপ থেকে দূরে রাখতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সহশিক্ষা কার্যক্রম- বিতর্ক, নাটক, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে সক্রিয় করতে হবে। ডিজিটাল লিটারেসি, নৈতিক শিক্ষা ও ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে।
শিক্ষার্থী হিসেবে এআই, গুগল ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পূর্বে বই ও শিক্ষকের সহায়তা খোঁজার চেষ্টা করতে হবে। অ্যাসাইনমেন্ট, কুইজের প্রশ্নোত্তর সরাসরি গুগল বা এআই টুলসের মাধ্যমে সমাধান না করে নিজে চেষ্টা করতে হবে। এতে তার চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও মনে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া পড়াশোনার সময় মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটায় এমন অ্যাপ বন্ধ রাখার মাধ্যমে মনোযোগের বিঘ্নতা এড়ানো সম্ভব। প্রযুক্তি একদিকে যেমন শিক্ষার বিপ্লব ঘটায়, তেমনই এর অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার আমাদের শিক্ষার মান কমিয়ে আনতে পারে। তাই এখনই সময় ডিজিটাল বন্দিত্ব থেকে আমাদের দেশের শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত প্রজন্মকে মুক্ত করে আনার।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
"





































