reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১ ঘণ্টা আগে

বাধ্যতামূলক হচ্ছে বাংলা কিউআর: ‘ক্যাসলেস দেশ গড়ায় বৈপ্লবিক পদক্ষেপ

আগামী ১ জুলাই থেকে দেশের প্রতিটি মুদি দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত শপিংমলে বাধ্যতামূলক হতে যাচ্ছে এক প্ল্যাটফর্মে সব ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যম ‘বাংলা কিউআর’।

কাগজের নোটের ঝক্কি এড়িয়ে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে এটি নিঃসন্দেহে একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যার হাত ধরে এই বিপ্লব সফল হওয়ার কথা—সেই মাঠপর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা এই উদ্যোগ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারেই রয়ে গেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে নেই কোনো দৃশ্যমান প্রচারণা, নেই মাঠপর্যায়ের সচেতনতা কর্মসূচি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেবল একটি ফেসবুক ভিডিও ছাড়া গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই বিষয়ে কোনো সাড়াশব্দ নেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা ছাড়া এই বাধ্যতামূলক নিয়ম কি অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হবে, নাকি উল্টো সাধারণ ব্যবসায়ী ও গ্রাহকদের ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি অনীহা তৈরি করবে?

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর জোর করে কোনো প্রযুক্তি চাপিয়ে না দিয়ে বরং তাদের প্রণোদনা দেওয়া উচিত। অন্যথায়, লেনদেন সামান্য কমলেও তার বড় আঘাত আসবে জাতীয় অর্থনীতিতে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দোকান ঘুরে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে তেমন কোনো প্রচারণা নাই। সামাজিক মাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমেও ব্যবসায়ীদের জানাতে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। কেবলমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেইসবুক পেইজে একটি প্রচারণার ভিডিও রয়েছে। দোকানিরা জানান, তাদের কাছে কেউ এখনও আসে নাই এই বিষয়ে কথা বলার জন্য।

তবে ব্যবসায়ী বলছেন, তাদের কাছে বিকাশের দেয়া একটি কিউআর রয়েছে, যেটি দিয়েই বিভিন্ন এমএফএসের লেনদেন করা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলা কিউআর নামে নতুন উদ্যোগ বা এর বাধ্যতামূলক বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি কোনো প্রচারণা তাদের কাছে পৌঁছায়নি।

বিকাশ কিংবা নগদের প্রতিনিধি আসলেও বাংলা কিউআর কোর্ডের বিষয়ে এখনও তেমন কিছু জানেন না ব্যবসায়ীরা।

কীভাবে সরকারের এ সেবা চালুর সঙ্গে বেসরকারি সেবা বিকাশ যুক্ত হলো? সরকারের পক্ষ থেকেই কি যৌথভাবে কাজ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে? তারা বলছেন, নিজেদের উদ্যোগেই ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে তাদের এ পদক্ষেপ।

বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশন শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যাশলেস লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের যাত্রাপথে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যেই দেশের সব মার্চেন্ট পয়েন্টে বাংলা কিউআর প্রচলন করতে বিকাশ বদ্ধপরিকর। অতীতের ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতেও ক্যাশলেস সমাজ গঠনের সরকারি উদ্যোগে সক্রিয় অংশীদার হিসেবে কাজ করবে বিকাশ। এ লক্ষ্যে কিউআর প্রতিস্থাপনের কাজ এখন পুরোদমে চলছে।’

ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস কিংবা পেমেন্ট সেবা একেক প্রতিষ্ঠানের জন্য একেকটি কিউআর কোড। সেই ভিন্নতার অবসান ঘটিয়ে এক প্ল্যাটফর্মে সব ধরনের ডিজিটাল লেনদেন আনতেই চালু হতে যাচ্ছে বাংলা কিউআর। তবে এতো বড় পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তুতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অতীতেও সরকারের অনেক ভালো উদ্যোগ পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাবে প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘সরকার এ সমস্ত জায়গাতে আমরা দেখেছি যে তারা তাদের নিজেদের প্রোডাক্ট খুব বেশি সেল করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে যেটা উচিত হবে মার্চেন্ট ব্যাংক যারা রয়েছেন, যারা এ ক্ষেত্রে এই সার্ভিসগুলো দিয়ে থাকেন বিভিন্ন ধরনের যে এমএফএস সার্ভিস যারা দিচ্ছেন, তাদেরকে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেয়া। এবং তাদের মাধ্যমে এ কিউআর কোডকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া।

সিপিডির এ গবেষণা পরিচালক আরও মনে করেন, স্বল্প পরিসরে এবার একক কিউআর ব্যবস্থা চালু হলেও সেটি ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের উৎসাহ বাড়াতে ছোট পরিসরে প্রণোদনা ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলে পরামর্শ তার।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদেরকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করবার একটা প্রক্রিয়া হতে পারে। তবে দ্বিতীয় যেটি হতে পারে, সেটি হলো তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা। উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে এটি হতে পারে যে, প্রতি ট্রানজেকশনের বিপরীতে তাদেরকে সরকার খুব ন্যূনতম মাত্রায় হলেও একটি ইনসেন্টিভ দিতে পারেন। ফলে সেই জায়গায় সেটির কারণেও তারা তখন চাইবেন যে, তারা যেকোনো ধরনের লেনদেন এটিকে তারা অনলাইনে করতে।’

ডিজিটাল লেনদেনকে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হলে ব্যবসায়ী ও গ্রাহক উভয়ের মধ্যেই অনীহা তৈরি হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন এ অর্থনীতিবিদ।

অর্থনীতিবিদ ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, ‘বাধ্য তো করা যাবে না। দোকানদার যদি দেখে কাস্টমার আসছে ক্যাশ নিয়ে, কাস্টমার কিউআর কোড ইউজ করতে চান না, বা দোকানদার যদি বলে আমি ক্যাশে বিক্রি করব, তাকে আপনি যদি বাধ্য করেন, তখন তার ট্রানজেকশন কমে আসবে। ট্রানজেকশন যদি ১ শতাংশ কমে, ইকোনমি শেষ। আমাদের কাজ হলো এক্সপেন্ডি মানে স্পেন্ডিং বাড়ানো। মানুষকে খরচ করতে উদ্বুদ্ধ করা। কারণ একজনের খরচ আরেকজনের ইনকাম।’

ক্যাশলেস বাংলাদেশের পথে বড় এ পদক্ষেপের যাত্রা সফল করতে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবায়ন এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়