ব্রাজিল-জাপান হচ্ছে মুখোমুখি, শেষ ষোলোয় উঠবে কে

আর ঘণ্টা দেড়েক পরেই বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ হিউস্টনে মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল ও জাপান। একদিকে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল। অন্যদিকে এশিয়ার সবচেয়ে সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী দলগুলোর একটি জাপান।
কাগজে-কলমে ব্রাজিল ফেভারিট, কিন্তু সাম্প্রতিক ফর্ম, বড় দলকে চমকে দেওয়ার ইতিহাস এবং আগের জয়ের স্মৃতি জাপানকে বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ বানিয়েছে।
বাংলাদেশ সময় সোমবার (২৯ জুন) রাত ১১টায় শুরু হবে ম্যাচটি। জয়ী দল উঠবে শেষ ষোলোয়। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হবে নরওয়ে ও আইভরি কোস্টের ম্যাচের জয়ী দল। নকআউট পর্ব হওয়ায় ভুলের সুযোগ নেই। একটি খারাপ সিদ্ধান্ত, একটি সেট পিস বা একজন খেলোয়াড়ের এক মুহূর্তই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
ব্রাজিল গ্রুপ পর্ব শুরু করেছিল মরক্কোর সঙ্গে ১-১ ড্র দিয়ে। এরপর হাইতিকে ৩-০ এবং স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ ‘সি’ চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করে সেলেসাওরা। শুরুটা খুব উজ্জ্বল না হলেও শেষ দুই ম্যাচে আক্রমণ, ভারসাম্য ও আত্মবিশ্বাসে উন্নতির ইঙ্গিত দিয়েছে আনচেলত্তির দল।
ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা এখন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তিন ম্যাচে চার গোল করেছেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। ব্রাজিলের সাত গোলের চারটিই তার। গ্রুপ পর্বে প্রতিটি ম্যাচেই ম্যাচসেরা হওয়ার মতো প্রভাব রেখেছেন তিনি। গতি, ড্রিবলিং, বক্সে ঢোকার সাহস এবং ফিনিশিং মিলিয়ে জাপানের রক্ষণকে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে তাকেই ঘিরে।
মাতেউস কুনিয়াও ব্রাজিলের আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। তার মুভমেন্ট খুব নির্দিষ্ট নয়, আর সেটিই প্রতিপক্ষের রক্ষণকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে কুনিয়ার বোঝাপড়া ও রায়ানের ডান দিকের গতি জাপানের ৩-৪-২-১ কাঠামোর জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে।
নেইমারের ফিটনেসও ম্যাচের বড় আলোচনার জায়গা। কাফ ইনজুরি কাটিয়ে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠে ফিরেছিলেন তিনি। সেই ম্যাচে ১৫ মিনিটের কিছু বেশি খেলেছিলেন ব্রাজিলিয়ান তারকা। জাপানের বিপক্ষে তাকে আরও বেশি সময় ব্যবহার করতে পারেন আনচেলত্তি। তবে তিনি শুরু করবেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
জাপানও আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামবে। গ্রুপ ‘এফ’-এ নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ২-২ ড্র দিয়ে শুরু করে তারা। এরপর তিউনিসিয়াকে ৪-০ গোলে হারায়। শেষ ম্যাচে সুইডেনের সঙ্গে ১-১ ড্র করে পাঁচ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হয় হাজিমে মোরিয়াসুর দল।
জাপানের আক্রমণে আয়াসে উয়েদা ও দাইচি কামাদা এখন পর্যন্ত দুটি করে গোল করেছেন। কেইতো নাকামুরা, জুনয়া ইতো ও দাইজেন মায়েদাও গোল পেয়েছেন। দল হিসেবে জাপানের শক্তি তাদের গতি, শৃঙ্খলা, চাপ তৈরি করার ক্ষমতা এবং দ্রুত ট্রানজিশন। তারা শুধু রক্ষণে বসে থাকার দল নয়, সুযোগ পেলে খুব দ্রুত আক্রমণে উঠতে পারে।
বড় দলের বিপক্ষে জাপানের আত্মবিশ্বাস নতুন নয়। ২০২২ বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় উঠেছিল তারা। এবারও নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনের মতো ইউরোপিয়ান দলের বিপক্ষে অপরাজিত থেকে নকআউটে এসেছে। তাই ব্রাজিলের বিপক্ষে তারা শুধু টিকে থাকার ভাবনা নিয়ে নামবে, এমন ভাবার সুযোগ নেই।
দুই দলের ইতিহাস অবশ্য ব্রাজিলের পক্ষে। সব মিলিয়ে ১৪ ম্যাচে ব্রাজিলের জয় ১১টি, ড্র ২টি, জাপানের জয় মাত্র ১টি। বিশ্বকাপে একমাত্র দেখা হয়েছিল ২০০৬ সালে। সেদিন ৪-১ গোলে জিতেছিল ব্রাজিল। তবে সেই পরিসংখ্যানই এবার জাপানের জন্য চ্যালেঞ্জের জায়গা।
জাপানের একমাত্র জয়টিই এখন ম্যাচের আগে বড় আলোচনায়। গত বছর প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলকে ৩-২ গোলে হারিয়েছিল তারা। ম্যাচে ব্রাজিল ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে জাপান ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পায়। প্রীতি ম্যাচ হলেও সেই ফল জাপানকে বিশ্বাস দিয়েছে, ব্রাজিলকে হারানো অসম্ভব নয়।
ব্রাজিল কোচ আনচেলত্তিও জাপানকে হালকা করে দেখছেন না। তার মতে, নকআউট ম্যাচে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। অতিরিক্ত সময়, টাইব্রেকার, চাপ, ভুল, সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে দলকে। জাপানকে তিনি সংগঠিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল হিসেবেই দেখছেন।
অপ্টার সুপারকম্পিউটার হিসাবেও ব্রাজিল এগিয়ে। নির্ধারিত সময়ে ব্রাজিলের জয়ের সম্ভাবনা ৫৮.৩ শতাংশ, জাপানের ১৮.১ শতাংশ। ম্যাচ অতিরিক্ত সময় বা টাইব্রেকারে যাওয়ার সম্ভাবনা ২৩.৬ শতাংশ। অর্থাৎ ব্রাজিল ফেভারিট হলেও ম্যাচ একপেশে হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
দুই দলেরই গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিতি আছে। ব্রাজিলের রাফিনিয়া হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে বাইরে। জাপানের তাকেফুসা কুবোর হাঁটুর চোট নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। কুবো না থাকলে জাপানের সৃজনশীলতায় প্রভাব পড়তে পারে, তবে মোরিয়াসুর দল ব্যক্তিগত তারকার চেয়ে সমষ্টিগত কাঠামোর ওপর বেশি নির্ভর করে।
সম্ভাব্য একাদশে ব্রাজিল ৪-৩-৩ ছকে নামতে পারে। গোলবারে আলিসন। রক্ষণে দানিলো, মারকিনিয়োস, গ্যাব্রিয়েল ও সান্তোস। মাঝমাঠে ব্রুনো গিমারায়েস, কাসেমিরো ও পাকেতা। আক্রমণে রায়ান, কুনিয়া ও ভিনিসিয়ুস। জাপান নামতে পারে ৩-৪-২-১ ছকে। গোলবারে সুজুকি। রক্ষণে তোমিয়াসু, তানিগুচি ও হিরোকি ইতো। মাঝমাঠে দোয়ান, সানো, তানাকা ও নাকামুরা। আক্রমণভাগে জুনয়া ইতো ও কামাদার পেছনে থাকবেন উয়েদা।
এই ম্যাচে ব্রাজিলের ব্যক্তিগত প্রতিভা বনাম জাপানের দলীয় শৃঙ্খলার লড়াই দেখা যাবে। ভিনিসিয়ুস যদি জায়গা পান, ম্যাচের মোড় একাই ঘুরিয়ে দিতে পারেন। আবার জাপান যদি ব্রাজিলের প্রেস ভেঙে দ্রুত আক্রমণে উঠতে পারে, আনচেলত্তির দলকেও অস্বস্তিতে পড়তে হবে।
সব মিলিয়ে ব্রাজিল ফেভারিট, কিন্তু জাপান বিপজ্জনক। ইতিহাস ব্রাজিলের, সাম্প্রতিক সাহস জাপানের। হিউস্টনের লড়াই তাই শুধু শেষ ষোলোর টিকিটের নয়, ব্রাজিলের শিরোপা-দাবির প্রথম বড় পরীক্ষাও।









































