শেখ জিল্লুর রহমান

  ২৯ জুন, ২০২৬

মুক্তমত

ব্রাজিল কি পারবে হেক্সা মিশন সফল করতে?

ফুটবল দুনিয়ায় ব্রাজিল মানেই এক আদিম উন্মাদনা, যার হলুদ জার্সির সম্মোহনী জাদুতে বুঁদ হয়ে থাকে কোটি কোটি চোখ। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে লাতিন আমেরিকার এই ফুটবল পরাশক্তির পারফরম্যান্স গ্রাফ ছিল চরম হতাশাজনক আর নাটকীয় ওঠানামার মধ্য দিয়ে যাওয়া এক গোলকধাঁধা। বিশেষ করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব এবং কোপা আমেরিকার কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে ট্রাইবেকারে হেরে বিদায় নেওয়ার পর, সেলেসাওদের সক্ষমতা আর ফুটবলীয় ঐতিহ্য নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে ৪-১ গোলের ভরাডুবি কিংবা প্যারাগুয়ে ও বলিভিয়ার মতো খর্বশক্তির দলের কাছে পরাজয়- ব্রাজিল সমর্থকদের হৃদয়ে কেবল শঙ্কার কাঁপন ধরায়নি, বরং ফুটবল রোমান্টিকদের মনে করিয়ে দিয়েছিল যে সাম্বার ছন্দ বোধহয় হারিয়ে গেছে।

তবে ২০২৬ সালের জুনে এসে, বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন, আগ্রাসী ও পুনরুজ্জীবিত ব্রাজিলকে দেখা যাচ্ছে। গ্রুপ পর্বের সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, সমালোচকদের মুখে ছাই দিয়ে সাম্বা আর্মিরা তাদের পুরোনো ধার ও লাতিন ফুটবলের চিরচেনা শৈল্পিক ছন্দ ফিরে পেতে শুরু করেছে। তিতের বিদায় ও পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন কোচদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরা কাটিয়ে বর্তমান ডাগআউটের কৌশল এখন মাঠে ফল দিতে শুরু করেছে।

চলতি জুন মাসের বিশ্বকাপ মঞ্চে ব্রাজিলের শক্তিমত্তার দিকে তাকালে এক বিধ্বংসী ও ক্ষুধার্ত রূপ ফুটে ওঠে। ১৪ জুন মরক্কোর মতো কঠিন, সুসংগঠিত ও কাউন্টার-অ্যাটাকিং রক্ষণভাগের বিরুদ্ধে ১-১ গোলে ড্র করে কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক চাপে পড়েছিল দল। মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে তখন আবারও পুরোনো শঙ্কা জেগে উঠেছিল। কিন্তু ২০ জুন হাইতিকে ৩-০ গোলে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের জাত চেনায় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ২৫ জুন স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩-০ গোলের দুর্দান্ত, দাপুটে ও একপেশে জয়টি নিশ্চিত করেছে যে, নকআউট পর্বের মহাযুদ্ধের জন্য তারা কতটা ক্ষুধার্ত ও প্রস্তুত। জুনের শুরুতে পানামাকে ৬-২ গোলে বিধ্বস্ত করা এবং মিসরের বিরুদ্ধে ২-১ গোলের কষ্টার্জিত কিন্তু আত্মবিশ্বাসী প্রীতি ম্যাচের জয়গুলো দলের ভেতরে জয়ের যে টনিক সরবরাহ করেছিল, তার প্রতিফলন এখন দেখা যাচ্ছে মূল মঞ্চে।

ব্রাজিলের বর্তমান স্কোয়াডের সবচেয়ে বড় ইউএসপি বা শক্তি হলো তাদের আক্রমণভাগ। জুনের ম্যাচগুলোতে গোল করার এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণদুর্গ চূর্ণ-বিচূর্ণ করার যে ধারাবাহিকতা তারা দেখিয়েছে, তা টুর্নামেন্টের যেকোনো হাই-প্রোফাইল রক্ষণভাগের জন্য রাতের ঘুম হারাম করার মতো কারণ। নেইমার-পরবর্তী যুগের ট্রানজিশন কাটিয়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো এবং তরুণ তুর্কিদের গতিশীল ফুটবল আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মাঝমাঠের নিখুঁত থ্রু-পাস আর উইংয়ের গতি- এই দুইয়ের মারাত্মক মিশ্রণে সেলেসাওরা এখন মাঠে প্রতিপক্ষকে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না।

তবে এই চোখধাঁধানো সাফল্যের চাকচিক্যের মাঝেও কিছুটা চিন্তার অন্ধকার রেখা রয়ে গেছে ব্রাজিলের রক্ষণভাগে। গত বছরের শেষ দিকে এবং ২০২৫-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত বাছাইপর্বে ক্রমাগত গোল হজম করা এবং তিউনিসিয়া বা ভেনিজুয়েলার মতো দলের সঙ্গে পয়েন্ট খোয়ানো ইঙ্গিত দেয় যে, হাই-প্রেসিং ফুটবলের বিপরীতে সেলেসাও ডিফেন্স লাইনে এখনো কিছুটা সমন্বয়হীনতা ও মনস্তাত্ত্বিক জড়তা রয়েছে। মরক্কোর বিরুদ্ধে ১-১ ড্র-র ম্যাচটি আবারও মনে করিয়ে দেয়, ইউরোপ বা আফ্রিকার গতিশীল ও কাউন্টার-অ্যাটাকিং দলগুলোর বিরুদ্ধে যখন প্রতি-আক্রমণ সামলাতে হয়, তখন ব্রাজিলের ডিফেন্স লাইন খেই হারিয়ে ফেলে। মারকুইনহোসদের নেতৃত্বাধীন ব্যাকলাইনকে আরো বেশি জমাট হতে হবে, অন্যথায় নকআউটের এক মুহূর্তের ভুল পুরো হেক্সা মিশনকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্বকাপে ঠিক কতদূর যেতে পারবে ব্রাজিল? তবে দেখা গেছে, গ্রুপ পর্বের এই চমৎকার ও বিধ্বংসী পারফরম্যান্সের পর এটা নিশ্চিত যে, ব্রাজিল মানসিকভাবে এক অভূতপূর্ব চাঙ্গা ভাব নিয়ে নকআউট পর্বে পা রাখছে। তবে নকআউট বা কোয়ার্টার ফাইনালের মতো ‘ডু অর ডাই’ ম্যাচে ব্রাজিলের ভাগ্য মূলত দুটি চিরন্তন সূত্রের ওপর নির্ভর করবে- প্রথমত, আক্রমণের শুরুতেই প্রতিপক্ষকে বোকা বানিয়ে দ্রুত গোল বের করে আনা এবং দ্বিতীয়ত, মাঝমাঠের পূর্ণ দখল ধরে রেখে রক্ষণভাগকে সম্পূর্ণ নিñিদ্র রাখা। নকআউটে কোনো ভুল সংশোধনের দ্বিতীয় সুযোগ থাকে না, আর সেখানেই ব্রাজিলের আসল পরীক্ষা।

যদি তারা স্কটল্যান্ড বা হাইতি ম্যাচের মতো ক্লিনশিট (গোল না হজম করা) বজায় রাখার ধারাবাহিকতা এবং স্নায়ুর চাপ ধরে রাখতে পারে, তবে এবার ব্রাজিলের সেমিফাইনাল বা ফাইনালের মহোৎসবের মঞ্চে পৌঁছানো অসম্ভব কিছু নয়। লাতিন ফুটবলের চিরায়ত জোঁগা বোনিতো বা শৈল্পিক পাসিংয়ের সঙ্গে যদি আধুনিক ফুটবলের গতির নিখুঁত ককটেল তারা ধরে রাখতে পারে, তবে ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক আসরেই হয়তো দীর্ঘ ২৪ বছরের খরা ও অপেক্ষার অবসান ঘটবে। ২০০২ সালের পর থেকে যে সোনার ট্রফিটার খোঁজে প্রতি চার বছর পর পর হাহাকার তৈরি হয়, হয়তো এবারই কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা সেই ষষ্ঠ ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে। ফুটবলপ্রেমীরা এখন অধীর আগ্রহে এবং দমবন্ধ করা উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছে সাম্বার এই নতুন ও বিজয়ী জয়যাত্রা দেখার জন্য। মিশন হেক্সা এবার কেবল স্বপ্ন নয়, ব্রাজিলের পায়ে পায়ে এখন ইতিহাস গড়ার রণধ্বনি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়