ড. শহীদুল ইসলাম
দৃষ্টিপাত
দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্য এবং পলিফেনল সমৃদ্ধ খাবার

পলিফেনল হলো উদ্ভিদজাত খাবারে পাওয়া এক ধরনের প্রাকৃতিক জৈব যৌগ, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী বলে আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে। উদ্ভিদ নিজেদেরকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, পোকামাকড়, ছত্রাক এবং পরিবেশগত ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য এই যৌগ তৈরি করে। মানুষ যখন ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, মসলা, চা এবং অন্যান্য উদ্ভিদজাত খাবার গ্রহণ করে, তখন এই পলিফেনল শরীরের ভেতরে নানা ধরনের সুরক্ষামূলক কাজ করে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্য এবং রোগ প্রতিরোধে পলিফেনল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান।
বর্তমান বিশ্বে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্থূলতা, ফ্যাটি লিভার এবং ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের কারণে এসব রোগের ঝুঁকি আরো বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পলিফেনল সমৃদ্ধ খাবারের গুরুত্ব অত্যন্ত বেড়ে গেছে।
পলিফেনলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা। আমাদের শরীরে প্রতিনিয়ত বিপাক ক্রিয়ার ফলে কিছু ক্ষতিকর অণু তৈরি হয়, যেগুলোকে ফ্রি র্যাডিক্যাল বলা হয়। এই ফ্রি র্যাডিক্যাল অতিরিক্ত পরিমাণে জমে গেলে কোষ, ডিএনএ, রক্তনালি এবং শরীরের বিভিন্ন টিস্যুর ক্ষতি করে। এই প্রক্রিয়াকে অক্সিডেটিভস্ট্রেস বলা হয়, যা বার্ধক্য, হৃদরোগ, ক্যানসার এবং স্নায়বিক রোগের অন্যতম কারণ। পলিফেনল এই ক্ষতিকর অণুগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে শরীরকে সুরক্ষা দেয়।
পলিফেনলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন কমানো। দীর্ঘমেয়াদি শরীরের ভেতরের অদৃশ্য প্রদাহ বর্তমানে বহু রোগের মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, স্থূলতা, হৃদরোগ এবং আলঝেইমারের মতো রোগের সঙ্গে এই দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পলিফেনল শরীরের প্রদাহজনিত প্রক্রিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং কোষের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে।
মানবদেহের অন্ত্রে থাকা কোটি কোটি উপকারী জীবাণুর সমষ্টিকে গাটমাইক্রোবায়োম বলা হয়। এই উপকারী জীবাণুগুলো হজম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং বিপাকক্রিয়ার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। অনেক পলিফেনল প্রিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে, অর্থাৎ এগুলো অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। ফলে হজমশক্তি ভালো থাকে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা বজায় থাকে।
হৃদরোগ প্রতিরোধেও পলিফেনলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি রক্তনালির কার্যকারিতা উন্নত করে, রক্তচাপনিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের অক্সিডেশন কমায়। ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ফলমূল, শাকসবজি, চা এবং মসলাযুক্ত খাবার খান, তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
পলিফেনল রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক। কিছু পলিফেনল ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বেড়ে যাওয়া কমায়। বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের হার যেভাবে বাড়ছে, তাতে পলিফেনল সমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মস্তিষ্কের সুস্থতা রক্ষার্থেও পলিফেনলের ভূমিকা রয়েছে। এটি স্নায়ুকোষকে সুরক্ষা দেয়, মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ উন্নত করে এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পলিফেনল সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করলে বয়সজনিত স্মৃতিভ্রংশ এবং আলঝেইমারের ঝুঁকি কমতে পারে।
পলিফেনলের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। এর মধ্যে ফ্ল্যাভোনয়েড সবচেয়ে পরিচিত এবং বহুল গবেষিত। কোয়ারসেটিন, ক্যাটেচিন এবং অ্যান্থোসায়ানিন এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া ফেনোলিক অ্যাসিড, স্টিলবিন এবং লিগনানও গুরুত্বপূর্ণ পলিফেনল। এসব যৌগ বিভিন্ন ফল, শাকসবজি, বীজ, ডাল এবং মসলায় পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে প্রচলিত বহু ফল পলিফেনলের উৎকৃষ্ট উৎস। আমে রয়েছে ম্যাঙ্গিফেরিন ও কোয়ারসেটিন, যা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। পেয়ারা ফ্ল্যাভোনয়েড ও ভিটামিন সি-তে সমৃদ্ধ। জামে রয়েছে অ্যান্থোসায়ানিন, যা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। ডালিম হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে। কাঁঠাল ও কলাতেও বিভিন্ন উপকারী ফেনোলিক যৌগ রয়েছে। এ ছাড়া আনারসেও রয়েছে ফেনোলিক অ্যাসিড ও ভিটামিন সি, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। তরমুজে লাইকোপিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা হৃদস্বাস্থ্য রক্ষা ও শরীরকে হাইড্রেট রাখতে সহায়ক। পেঁপে হজমশক্তি উন্নত করে এবং এতে থাকা বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে সুরক্ষা দেয়। কমলা, মাল্টা, লেবু এবং বাতাবি লেবুর মতো সাইট্রাস ফলেও প্রচুর ফ্ল্যাভোনয়েড রয়েছে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। আঙুর, বরই, লিচু, কামরাঙা এবং বেলেও গুরুত্বপূর্ণ পলিফেনল পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের শাকসবজিও পলিফেনলের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বেগুনে রয়েছে নাসুনিন নামের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। পালং শাক ও লাল শাকে প্রচুর ফ্ল্যাভোনয়েড এবং ফেনোলিক অ্যাসিড রয়েছে। করলা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং ঢেঁড়সে রয়েছে উপকারী ফ্ল্যাভোনয়েড ও আঁশ। এ ছাড়া ব্রকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও শালগমজাতীয় সবজিতে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক বলে মনে করা হয়। টমেটোতে লাইকোপিন রয়েছে, যা হৃদস্বাস্থ্য ও ত্বকের জন্য উপকারী। গাজরে বিটা-ক্যারোটিন ও ফেনোলিকযৌগ রয়েছে, যা চোখের স্বাস্থ্য রক্ষা করে। কুমড়া, মিষ্টিআলু, শিম, বরবটি, কচুশাক, পুঁইশাক, মুলা, লাউ, ঝিঙা, চিচিংগা এবং কাঁচামরিচেও বিভিন্ন ধরনের পলিফেনল পাওয়া যায়। পেঁয়াজ ও রসুনে থাকা সালফারযৌগ এবং ফ্ল্যাভোনয়েড হৃদরোগ প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশি রান্নায় ব্যবহৃত মসলাগুলোও অত্যন্ত সমৃদ্ধ পলিফেনলের উৎস। হলুদে থাকা কারকিউমিন বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি গবেষিত প্রদাহ নাশক যৌগগুলোর একটি। দারুচিনি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। লবঙ্গ অত্যন্ত উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ একটি মসলা। এ ছাড়া আদা, জিরা, ধনে, এলাচ, গোলমরিচ এবং মেথিতেও প্রচুর উপকারী পলিফেনল রয়েছে।
চা বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয় এবং এটি পলিফেনলের বড় উৎস। কালো চা ও সবুজ চায়েক্যাটেচিন, ফ্ল্যাভোনয়েড ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা হৃদস্বাস্থ্য ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করতে সহায়ক। তবে অতিরিক্ত চিনি দিয়ে চা পান করলে এর স্বাস্থ্য উপকারিতা কমে যেতে পারে।
ডাল, ছোলা, মসুর এবং পূর্ণ শস্যও পলিফেনলের ভালো উৎস। লাল চাল ও ব্রাউন রাইসেফেনোলিক অ্যাসিড থাকে, কিন্তু অতিরিক্ত পালিশ করা সাদা চালে এসব উপকারী উপাদান অনেকাংশে কমে যায়।
বাংলাদেশে পলিফেনল গ্রহণ নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা এখনো সীমিত। তবে ধারণা করা হয়, আগে গ্রামীণ মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রচুর শাকসবজি, ডাল, ফল ও মসলা থাকায় তাদের পলিফেনল গ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। বর্তমানে শহুরে জীবনযাপন, ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের কারণে এই গ্রহণ কমে যাচ্ছে। এর ফল হিসেবে ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
পলিফেনল গ্রহণ বাড়ানোর জন্য খুব ব্যয়বহুল খাবার বা সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন বিভিন্ন রঙের ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া, মৌসুমি ফল বেছে নেওয়া, ডাল ও পূর্ণ শস্য গ্রহণ করা এবং রান্নায় ঐতিহ্যবাহী মসলা ব্যবহার করলেই পলিফেনল গ্রহণ বাড়ানো সম্ভব। চিনি কমিয়ে চা পান করা এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে প্রাকৃতিক খাবার বেছে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ধরনের পলিফেনল সাপ্লিমেন্ট পাওয়া গেলেও গবেষকরা মনে করেন, সম্পূর্ণ খাবার থেকেই পলিফেনল গ্রহণ সবচেয়ে কার্যকর। কারণ প্রাকৃতিক খাবারে পলিফেনলের পাশাপাশি আঁশ, ভিটামিন, খনিজ এবং অন্যান্য উপকারী উপাদানও থাকে, যা একসঙ্গে শরীরে আরো ভালো প্রভাব ফেলে।
সবশেষে বলা যায়, পলিফেনল মানব স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক উপাদান। এটি শরীরকে অক্সিডেটিভস্ট্রেস ও প্রদাহ থেকে রক্ষা করে, হৃদস্বাস্থ্য উন্নত করে, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংস্কৃতিতে পলিফেনল সমৃদ্ধ বহু খাবার রয়েছে। তাই আধুনিক প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসে ফিরে যাওয়া আমাদের সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : খাদ্য বিজ্ঞানী, ইউকে
"




































