মাসুম বিল্লাহ

  ৪ ঘণ্টা আগে

মুক্তমত

ভাঙা সংসারের নীরব কান্না

পরিবার মানুষের জীবনের প্রথম বিদ্যালয় যেখানে একজন মানুষ ভালোবাসা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধের শিক্ষা লাভ করে। একটি সুন্দর পরিবার শুধু কয়েকজন মানুষের একসঙ্গে বসবাসের নাম নয়, এটি একটি শিশুর নিরাপদ বেড়ে ওঠার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, একটি শিশুকে মানুষ করতে হলে তাকে শুধু শিক্ষা নয়, ভালোবাসার জন্য একটি উত্তম পরিবেশও দিতে হবে। যেখানে একটি আদর্শ পরিবার থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে পারিবারিক বন্ধনের এই জায়গাটিতেই দেখা দিচ্ছে নানা সংকট এবং অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাস।

দাম্পত্যের কলহ, পারস্পরিক অবিশ্বাস, সহনশীলতার অভাব, ভুল বোঝাবুঝি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার কারণে দেশে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ক্রমেই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে। বিচ্ছেদ কখনো কখনো একটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত হতে পারে। যেখানে দাম্পত্য সম্পর্কে নির্যাতন, অসম্মান বা অসহনীয় পরিস্থিতি রয়েছে সেখানে আলাদা হয়ে যাওয়া অনেক সময় কল্যাণকর। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই সামান্য মতবিরোধ, অভিমান, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা সাময়িক আবেগের কারণে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে। আর এই ভাঙনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সেই সন্তানদের যারা কোনো সিদ্ধান্তের অংশীদার নয়। অথচ তারাই হয়ে উঠছে বিচ্ছেদের নীরব শিকার।

সম্প্রতি দেশে বিবাহবিচ্ছেদের পরিসংখ্যান পারিবারিক পরিবর্তনের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সেখানে ৫ হাজার ৪৫৯টি বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে নারীদের পক্ষ থেকে করা আবেদনের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪৬৭টি যা মোট আবেদনের প্রায় ৬৩ শতাংশ। পুরুষদের পক্ষ থেকে আবেদন ছিল ১ হাজার ৯৯০টি। অন্যদিকে বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের তথ্যেও দেখা যাচ্ছে বিচ্ছেদের ঘটনায় নারী ও পুরুষ উভয়েই যুক্ত থাকলেও নারীদের পক্ষ থেকে বিচ্ছেদের আবেদন অনেক ক্ষেত্রে বেশ কয়েকগুণ বেশি। এসব সংখ্যা শুধু বিচ্ছেদের হিসাব নয় বরং বদলে যাওয়া পারিবারিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

বিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল বলেছিলেন, ‘পরিবার হলো সমাজের প্রথম ভিত্তি’। একটি পরিবারের ভাঙন তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়। এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজে। কারণ পরিবার থেকেই শিশুর চরিত্র, চিন্তা ও মূল্যবোধের বিকাশ শুরু হয়। একটি ভাঙা পরিবারের কষ্টের সবচেয়ে গভীর অনুভূতি অনেক সময় প্রকাশ করতে পারে না শিশুরা। তারা হাসে, পড়াশোনা করে, স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে কিন্তু মনের ভেতরে তৈরি হয় এক ধরনের শূন্যতা। হ্রদয়ে তৈরি হয় অসংখ্য অদেখা ক্ষত।

বিচ্ছেদের পর অনেক সন্তান বাবা অথবা মায়ের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়। কেউ নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে না, কেউ আত্মবিশ্বাস হারায়, আবার কেউ মানসিক চাপের কারণে আচরণগত পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। মা-বাবার মধ্যে বিরোধের সময় সন্তানকে যখন একজনের পক্ষ নিতে বাধ্য করা হয়, তখন তার কোমল মনে তৈরি হয় গভীর ক্ষত। আজকের সমাজে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যত দ্রুত হচ্ছে, পারিবারিক বন্ধন ও মানবিক সম্পর্কের জায়গায় তত বেশি সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

অনেক সময় দেখা যায়, বিচ্ছেদের পর স্বামী-স্ত্রী দুজনই নিজেদের জীবন নতুনভাবে সাজিয়ে নেন। কিন্তু সন্তানকে ঘিরে তাদের দায়িত্ব শেষ হয় না। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অবসান ঘটতে পারে কিন্তু মা-বাবার দায়িত্বের অবসান কখনো হতে পারে না। সন্তানের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হলে উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল হতে হবে। দাম্পত্য জীবনে মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। দুটি ভিন্ন মানুষ যখন একসঙ্গে জীবন কাটান, তখন ভুল বোঝাবুঝি আসতেই পারে। কিন্তু প্রতিটি সমস্যার সমাধান বিচ্ছেদ নয়। অনেক সংকট আলোচনার মাধ্যমে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ধৈর্যের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।

আমেরিকান কবি ও লেখক খলিল জিবরান বলেছেন, তোমাদের সন্তান তোমাদের সন্তান নয়, তারা জীবনের নিজের আকাঙ্ক্ষার পুত্র-কন্যা। তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, কিন্তু তোমাদের থেকে আসে না। তাই সন্তানকে নিজের সম্পত্তি নয়, আলাদা সত্তা হিসেবে সম্মান ও যত্ন দিতে হবে। তাদের ভবিষৎ রক্ষা আমাদের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব শুধু মা-বাবার নয়, পুরো সমাজের। কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নাগরিক। তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব ভবিষ্যৎ সমাজেও পড়বে। তাই বিবাহবিচ্ছেদের বিষয়টিকে শুধু নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি শিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা, মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ জীবন। পরিবারে ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্ববোধের চর্চা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে প্রয়োজন পারিবারিক কাউন্সেলিং, সামাজিক সচেতনতা এবং সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি। পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধি করা। নিজেদের কলহ বিবাদ নিজেদের মাধ্যমে সমাধান করা। সরকার নির্ধারিত বয়সের মধ্যে ছেলে মেয়ে বিবাহ দেওয়া।

মনে রাখতে হবে, একটি সংসার ভাঙার আগে শুধু নিজের কষ্টের কথা নয়, সন্তানের চোখের জলও দেখতে হবে। নিজে ভালো থাকার জন্য আগত-অনাগত শিশুর ভালোর কথাও ভাবতে হবে। কারণ বিচ্ছেদের কাগজে স্বাক্ষর করেন দুজন মানুষ, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের অদৃশ্য কষ্ট অনেক সময় বহন করে একটি নিষ্পাপ শিশু। সম্পর্ক ভাঙতে সময় লাগে না, কিন্তু ভাঙা সম্পর্কের ক্ষত সারতে অনেক সময় লেগে যায়। তাই প্রয়োজন এমন একটি সমাজ যেখানে মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু মানবিকতা হারিয়ে যাবে না। যেখানে অধিকার থাকবে, কিন্তু দায়িত্ববোধও থাকবে। যেখানে বিচ্ছেদের আগে শেষবারের মতো ভাবা হবে একটি শিশুর আগামীকাল নিয়ে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়