রেজাউল করিম খোকন

  ৪ ঘণ্টা আগে

বিশ্লেষণ

বিপরীতমুখী দুই সংকটে অর্থনীতি

বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা বনাম আর্থিক খাতের সংস্কার এখন আমাদের অর্থনীতিতে গভীর সংকটের সৃষ্টি করেছে। বিপরীতমুখী দুটি ব্যাপার নিয়ে রীতিমতো নাভিশ্বাস অবস্থা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের। অর্থনীতিতে এই সংকট আজকের নতুন কোনো বিষয় নয়। বিগত আওয়ামী লীগের সরকারের আমলেও এটা পরিলক্ষিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন করে তিন বছর মেয়াদি ঋণের আবেদন করেছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে আইএমএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর চিঠিতে ঋণের পরিমাণ উল্লেখ নেই। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য পরিমাণ হতে পারে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদ।

কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে চাপে পড়লে আইএমএফের কাছে ঋণের জন্য যায়। সংস্থাটির ঋণের সুদহার কম। তবে শর্ত কঠিন। আইএমএফের শর্ত মেনে সরকারকে নানা সংস্কার করতে হয়। সংস্কারে ব্যর্থ হলে ঋণের কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দেয় আইএমএফ। দেশে আইএমএফের শর্তের কারণেই জ্বালানি তেলে সরকারি ভর্তুকি প্রায় তুলে নিয়ে মাসে মাসে মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি চালু হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের পতনের পর ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণের চুক্তি করেছিল। ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই ঋণের আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। অনুমোদিত ওই ঋণ কর্মসূচির আওতায় পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড় নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি শর্ত পূরণ না হওয়ার কারণে।

ওয়াশিংটনে গত বছরের অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক বৈঠকে অংশ নিয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ কিস্তি ছাড়ে আইএমএফকে রাজি করাতে পারেননি। এবার বিএনপি সরকার এমন একটা সময়ে আইএমএফের কাছে নতুন ঋণের জন্য গেল, যখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ মোটামুটি ভালো। কিন্তু তা বেড়েছে মূলত আমদানি কমে যাওয়ায়। আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। অন্যদিকে বড় বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের বাড়তি টাকাও দরকার। আইএমএফকে দেওয়া চিঠিতে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আগের কর্মসূচি গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতা এখন আর নেই। দেশীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন চ্যালেঞ্জের কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে সরকার সংস্কার কর্মসূচি থেকে সরে আসতে চায় না; বরং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করতে চায়।

নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আইএমএফকে চিঠি পাঠানোর প্রেক্ষিতে আগামী মাসে সংস্থাটির একটি দল ঢাকা সফরে আসবে। দেশের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। রাজস্ব-জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) হার ৮ শতাংশের ঘরে। চলতি অর্থবছর শেষে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ৮৮ হাজার কোটি টাকা। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের নিম্ন রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতকে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের সময় দেশের ঘাড়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। গত মে ২০২৬ এ প্রকাশিত ডেট (ঋণ) বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মোট ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় দেড় বছরের কম সময়ে সরকারি ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

এদিকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ আর পাওয়া যাবে না। এ বছরের মার্চ শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ৭৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৬১ দশমিক ৯৭ শতাংশ স্বল্পসুদে বা রেয়াতি ঋণ। আগামী বছরগুলোয় সরকারের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়বে। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তাতে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যার মধ্যে সুদ বাবদ বরাদ্দ ৪৬ হাজার কোটি টাকার সমান বৈদেশিক মুদ্রা। সরকারের মোট ঋণের ৫৭ শতাংশই দেশি ঋণ। অর্থাৎ সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ব্যাপক ঋণ নিচ্ছে, যখন বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৫ শতাংশের নিচে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগে অনীহা এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে ঋণ প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী রয়েছে। ফলে কর্মসংস্থান কম তৈরি হচ্ছে। বেকারত্ব প্রকট হয়ে উঠছে ক্রমেই। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে (১১ মাস) রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ কম। একমাত্র ইতিবাচক সূচক প্রবাসী আয়। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত দেশে ৩৪ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময় থেকে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ মোকাবিলায় অর্থায়ন পেতে চায়, অন্যদিকে আগের কর্মসূচিতে আটকে থাকা সংস্কারগুলো নতুন সময়সূচি ও বাস্তবতার আলোকে পুনর্গঠনের সুযোগ খুঁজছে।

আগের কর্মসূচি কেন থেমে গেল, তার একটি ব্যবচ্ছেদ থাকা প্রয়োজন। জ্বালানি মূল্যের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়, রাজস্ব খাতের সংস্কার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং ব্যাংক খাত সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়াই হয়তো মূল বাধা ছিল। এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফের এক ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে তিন বছর মেয়াদি নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এরপর ৩ জুন আইএমএফের বাংলাদেশবিষয়ক মিশন প্রধান বলেছেন, ২০২৩ সালে কর্মসূচি অনুমোদনের পর বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, নিম্ন রাজস্ব আহরণ এবং নতুন সংস্কার উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা এখন আরো স্পষ্ট। ফলে বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও নতুন সরকারের অগ্রাধিকারকে প্রতিফলিত করে একটি নতুন কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ওই বিবৃতির ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝি আইএমএফের একটি প্রাক-মিশন ঢাকা সফরে আসছে। প্রায় এক সপ্তাহ অবস্থান করে দলটি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করবে। ওই সফরে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নীতিগত অগ্রাধিকার, সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির আকার নিয়ে আলোচনা হবে।

সরকার এরই মধ্যে আইএমএফকে জানিয়েছে, সংস্কার কর্মসূচি ধাপে ধাপে এবং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে জনগণের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয়। নতুন কর্মসূচির আলোচনায় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ভ্যাট সংস্কার, করছাড় কমানো এবং কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। একই সঙ্গে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু

করা, ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং খেলাপি ঋণ কমানোর অগ্রগতিও খতিয়ে দেখবে আইএমএফ।

তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে- নতুন ঋণের প্রবাহ কমছে, অনুদান কমছে, অথচ ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে। ফলে উন্নয়ন অর্থায়নের যে সুবিধা বৈদেশিক ঋণ থেকে পাওয়ার কথা, তার বড় অংশই এখন পুরোনো দায় পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, উন্নয়ন ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে। এখন সময় এসেছে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ নয়, বরং ঋণের গুণগত ব্যবহার, প্রকল্পের অর্থনৈতিক ফলন এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার। কারণ ঋণ তখনই টেকসই হয়, যখন সেই ঋণ ভবিষ্যতে নিজেই নিজের পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি করে। বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়